রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় কাজ চলছে
রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় কাজ চলছে

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদন ও ক্রয়াদেশ কমেছে, কর্মী ছাঁটাই চলছে

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ আপাতত থামলেও তার অভিঘাত টের পাচ্ছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিতে দেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, চাপে পড়েছে।

বাংলাদেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং মিলগুলো ব্যাপকভাবে গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর। বাস্তবতা হলো, এই তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় গেছে বেড়ে।

এর মধ্যে গত ৬ জুন বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানার প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী। পশ্চিমা ব্র্যান্ড যেমন জারা ও এইচঅ্যান্ডএমের জন্য পোশাক তৈরি করেন তাঁরা। এই শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ৪ কোটি মানুষ। সংখ্যাটির তাৎপর্য হলো, এটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পাঁচ ভাগের চার ভাগই এসেছে পোশাক খাত থেকে, জিডিপিতেও তার অবদান ১৩ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ওপরে আছে শুধু চীন।

তবে এই খাত আগে থেকেই সংকটে আছে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা লাগে বলে মন্তব্য করেন শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব।

সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, পাঁচটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের কারাবন্দী বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতারও পোশাক কারখানা ছিল। গত তিন বছরে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে।

গত মে মাসে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে।

এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন বলেন, এই শিল্প দক্ষতানির্ভর, সেখানে জেনারেটর চালু করতেই যদি ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে, তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

উৎপাদনে বিলম্ব, জাহাজীকরণে বিঘ্ন ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতাদের কম চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছে। এক জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর তাঁর কারখানার ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে ৮ শতাংশ।

বেড়েছে কাঁচামালের খরচ

তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ যায় কৃত্রিম তন্তু, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বোতাম ও চেইনে, যেগুলোর বেশির ভাগই পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যার মূল উপাদান ন্যাফথা। যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এ ছাড়া উৎপাদনব্যবস্থাও খণ্ডিত। কিছু সমন্বিত টেক্সটাইল মিল থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়। আবদুল্লাহ হিল নকিবের হিসাবে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

সংকটগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর বড় অংশই বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক খাতের জন্য। তবে এই ঋণের সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। উদ্যোক্তারা এমনিতে চাপে আছেন, তাঁদের জন্য এটা কঠিন।

এদিকে কোভিড মহামারির সময় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বড় ব্র্যান্ডগুলো পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যে শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি হবে—এমন শঙ্কা আছে।

মাধবপুরের কোরটেক্স অ্যাপারেলসে কাজ করা সামলী খাতুন ৭ জুন কারখানায় গিয়ে দেখেন, ফটকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ ঝুলছে। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন কাজ পাওয়া আমার জন্য খুব কঠিন হবে। নারী হিসেবে সুযোগও কম। হয়তো আমাকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।’