দেশে জুতার বাজারে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বেশি ব্যবসা করেছে এপেক্স ফুটওয়্যার। আবার দেশীয় কোম্পানিটির চেয়ে ২৩৬ কোটি টাকা কম ব্যবসা করেও মুনাফার শীর্ষে অবস্থান করছে বহুজাতিক কোম্পানি বাটা শু। অর্থাৎ এপেক্সের বিক্রি বেশি, মুনাফা কম; আর বাটা কম বিক্রি করেও মুনাফা বেশি করেছে।
দেশি–বিদেশি এই দুটি প্রতিযোগী কোম্পানির মুনাফায় বড় পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে মূলত উৎপাদন খরচ ও ব্যাংকঋণ। এর মধ্যে এপেক্সের ব্যবসা দেশের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেও বিস্তৃত। অন্যদিকে বাটার ব্যবসায়ের সিংহভাগই হয় স্থানীয় বাজারে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্থানীয় বাজারের চেয়ে রপ্তানি বাজারের জন্য পণ্য তৈরি তথা উৎপাদন খরচ ও করের বোঝা অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাই রপ্তানি বাজারের কারণে বাটার চেয়ে এপেক্সের পণ্য উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই দুই কোম্পানির চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কোম্পানি দুটি তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ব্যবসা ও মুনাফার চিত্র
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি–মার্চ তিন মাসে এপেক্স ফুটওয়্যার ব্যবসা করেছে ৬১৬ কোটি টাকার। একই সময়ে বহুজাতিক কোম্পানি বাটা ব্যবসা করেছে ৩৮০ কোটি টাকার, যা এপেক্সের তুলনায় ২৩৬ কোটি টাকা বা প্রায় ৬২ শতাংশ কম। ৬১৬ কোটি টাকার ব্যবসা বা বিক্রিতে এপেক্সের মুনাফা হয়েছে ১ কোটি টাকার কিছু বেশি। অন্যদিকে বাটা ৩৮০ কোটি টাকার ব্যবসার বিপরীতে মুনাফা করেছে ৩৭ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ এপেক্সের চেয়ে ৩৬ কোটি টাকা বেশি মুনাফা করেছে বাটা। বিক্রি ও নিট মুনাফার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০০ টাকার ব্যবসা করে এপেক্স যেখানে মুনাফা করছে ১৭ পয়সা, সেখানে বাটার মুনাফা হয়েছে প্রায় ১০ টাকা।
কেন বেশি ব্যবসা করেও ভালো মুনাফা করতে পারেনি এপেক্স, অন্যদিকে কম বিক্রি করেও বাটা কীভাবে এপেক্সের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা করল? কোম্পানি দুটির আর্থিক প্রতিবেদনেই তার কিছুটা উত্তর রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাটার তুলনায় এপেক্সের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। উৎপাদন খরচের বড় তফাৎ মূলত এই দুই কোম্পানির মুনাফায় বড় ব্যবধান তৈরি করে দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধও দুই কোম্পানির মুনাফার ব্যবধান বাড়িয়েছে।
বাটার পক্ষ থেকে লিখিত এক বক্তব্যে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও মাথাপিছু অন্যান্য খরচ তুলনামূলক বেশি। আবার রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বা রপ্তানি প্রণোদনাও পায় না প্রতিষ্ঠানটি। তার পরও দক্ষ উৎপাদন পরিকল্পনা, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নগদ অর্থপ্রবাহের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। নৈতিক ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, সুশৃঙ্খল আর্থিক চর্চা এবং দায়িত্বশীল কর প্রদানের সংস্কৃতিই বাটার ব্যবসায়িক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। বাটা ধারাবাহিকভাবে দায়িত্বশীল ও পূর্ণাঙ্গ মুনাফা প্রদর্শন করে আসছে।
দেশের করব্যবস্থা ও সরকারি নীতি অনেকটাই রপ্তানিবিরোধী। এ কারণে স্থানীয় বাজারনির্ভর কোম্পানির চেয়ে আমাদের মতো রপ্তানিনির্ভর কোম্পানিকে অনেক বেশি চাপে থাকতে হয়।সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, এমডি, এপেক্স ফুটওয়্যার
মুনাফা বাড়ে–কমে উৎপাদন খরচে
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৩৮০ কোটি টাকার আয় বা পণ্য বিক্রির বিপরীতে বাটার উৎপাদন খরচ ছিল ২০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাটা শু পণ্য বিক্রি করে যে আয় করেছে, সেই আয়ের ৫৪ শতাংশ পণ্য উৎপাদনে খরচ হয়েছে। আর ৬১৬ কোটি টাকার আয় বা বিক্রির বিপরীতে এপেক্সের পণ্য উৎপাদনের খরচ ছিল ৪৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির আয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই পণ্য উৎপাদনের পেছনে খরচ হয়ে গেছে। এই হিসাবে দেখা যায়, পণ্য বিক্রির আয় থেকে উৎপাদন খরচ বাদ যাওয়ার পর প্রতি ১০০ টাকায় বাটার হাতে থাকে ৪৬ টাকা। আর এপেক্সের হাতে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে থাকে মাত্র ২১ টাকা। এ কারণে ভালো ব্যবসা করেও মুনাফায় তারা পিছিয়ে পড়েছে।
জানতে চাইলে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, দেশের করব্যবস্থা ও সরকারি নীতি অনেকটাই রপ্তানিবিরোধী। এ কারণে স্থানীয় বাজারনির্ভর কোম্পানির চেয়ে আমাদের মতো রপ্তানিনির্ভর কোম্পানিকে অনেক বেশি চাপে থাকতে হয়। রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকার লেনদেনের ওপর ১ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখে। এই অর্থ আর ফেরত পাওয়া যায় না। তাতে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত খুব বেশি মুনাফা না করলেও অনেক বেশি কর দিতে হয়; আর স্থানীয় বাজারে যারা ব্যবসা করেন, তাঁদের কর দিতে হয় মুনাফার ওপর।’
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও পণ্যের মান ধরে রাখতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এতেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়; আর স্থানীয় বাজারে যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁরা স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারেন। তাতে খরচ কম পড়ে। এ কারণে বেশি ব্যবসা করেও মুনাফায় পিছিয়ে পড়ছি আমরা। মূলত রপ্তানিনির্ভরতা আমাদের বেশি মুনাফার পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ব্যাংকঋণ–নির্ভরতার প্রভাব
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ব্যাংকঋণ–নির্ভরতার কারণেও মুনাফায় বাটার চেয়ে এপেক্স পিছিয়ে পড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি–মার্চ সময়ে এপেক্স ফুটওয়্যারকে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ খরচ করতে হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। সেখানে একই সময়ে ঋণের সুদ বাবদ বাটার খরচ ছিল মাত্র সোয়া ছয় কোটি টাকা। অর্থাৎ বাটার চেয়ে এপেক্স অনেক বেশি ব্যাংকঋণ–নির্ভর। এতে এপেক্সের আয়ের একটি বড় অংশ সুদ বাবদ চলে যায়। ফলে টান পড়ে কোম্পানিটির মুনাফায়।
পণ্য বিক্রির আয় থেকে সব ধরনের খরচ ও কর বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা নির্দিষ্ট সময়ে ওই কোম্পানির মুনাফা হিসেবে যুক্ত হয়। তাই উৎপাদন থেকে শুরু করে কর বাবদ খরচ বেশি পড়ে যে কোম্পানির, তাদের মুনাফা তত কম হয়।
এ বিষয়ে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বাটা বহুজাতিক কোম্পানি। বাংলাদেশেও কোম্পানিটি অনেক পুরোনো। তাই তাদের ব্যাংকঋণ–নির্ভরতা অনেক কম। সেই তুলনায় আমাদের ব্যাংকঋণের নির্ভরতা অনেক বেশি। এ কারণেও আমরা ভালো ব্যবসা করেও মুনাফায় বাটার চেয়ে পিছিয়ে থাকি।’
রপ্তানিও পার্থক্য গড়ে দেয়
আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, গত জানুয়ারি–মার্চ প্রান্তিকে ৩৮০ কোটি টাকার আয়ের মধ্যে বাটার রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ছয় লাখ টাকা। সেখানে এপেক্সের ৬১৬ কোটি টাকার আয়ের মধ্যে রপ্তানি খাত থেকে আসে ৫০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ বাটার চেয়ে এপেক্স অনেক বেশি রপ্তানিনির্ভর।
রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় বাজারের চেয়ে রপ্তানি বাজার এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। বৈশ্বিক বাজার প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় করনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাড়তি দাম, ব্যাংকঋণের চড়া সুদ। ফলে জুতার ব্যবসায় স্থানীয় বাজারের বদলে রপ্তানি বাজারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো করব্যবস্থা ও সরকারি নীতি সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এদিকে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মুনাফায় বাটার চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও সর্বশেষ হিসাব বছরে মুনাফায় এগিয়ে ছিল এপেক্স। কোম্পানিটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুনাফা করেছিল সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে বাটা ২০২৫ সালে মুনাফা করে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বাটা আর্থিক হিসাব করে জানুয়ারি–ডিসেম্বর ভিত্তিতে; আর এপেক্স হিসাব করে অর্থবছরের (জুলাই–জুন) সঙ্গে মিলিয়ে।