
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ খাতের কোম্পানি নাভানা ফার্মা আবারও দখলে নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেছেন এটির পদত্যাগ করা কয়েকজন প্রভাবশালী শেয়ারধারী। তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই ও তাঁর পরিবার এবং তাঁদের সহযোগী আদনান ইমাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পলাতক অবস্থা থেকেই কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেছেন। তাঁদের সহায়তা করছেন বিদ্যমান একজন শেয়ারধারী।
এ নিয়ে নাভানা ফার্মার বর্তমান পরিচালকদের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) ‘জোর করে কোম্পানি’ দখলের চেষ্টার অভিযোগ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে বিএসইসি এ ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। তার ভিত্তিতে কোম্পানিটি দখলের চেষ্টার ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়া পর্যন্ত পুনর্গঠিত পর্ষদ বহাল রাখা হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিএসইসির কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে, কোম্পানিটি ‘জোর করে দখলের’ চেষ্টা চলছে। তাই আমরা পুরো ঘটনা তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবেআবুল কালাম, মুখপাত্র, বিএসইসি
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, নাভানা ফার্মা দখলের চেষ্টাসহ সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটিতে সংঘটিত ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো. লুৎফুল কবির ও মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সহকারী পরিচালক মতিউর রহমান ও নিজাম উদ্দিন।
কোম্পানি ও বিএসইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানায়, গত ২৮ জানুয়ারি নাভানা ফার্মার ৬৫তম পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাইব্রিড পদ্ধতিতে (কেউ সশরীর ও কেউ অনলাইনে অংশ নেন) অনুষ্ঠিত সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ। একপর্যায়ে অনলাইনে সভায় যুক্ত হন কোম্পানিটির কয়েকজন সাবেক পরিচালক। তাঁরা হলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী, আনিসুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী ইমরানা জামান, তাঁদের সহযোগী আদনান ইমাম ও তাঁর বোন জাহার রসুল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এসব পরিচালক পলাতক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নামে একাধিক মামলাও রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আনিসুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামান কোম্পানিটির পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। একই বছরের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন আদনান ইমামের বোন জাহার রসুল। তখন তাঁদের পদত্যাগ নিয়ম অনুযায়ী কোম্পানির পর্ষদ সভায় গৃহীত হয়।
জানা গেছে, আদনান ইমামের নামে কোম্পানির কোনো শেয়ার নেই। তবে বেনামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যের নামে কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে। আদনান ইমাম নিজে শেয়ারধারী না হলেও ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে তিনি ছিলেন আনিসুজ্জামান চৌধুরীসহ সাইফুজ্জামান চৌধুরীদের নানা আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের সহযোগী।
সূত্রটি জানায়, পদত্যাগ করা সাবেক তিন পরিচালকসহ আদনান ইমাম হঠাৎ গত ২৮ জানুয়ারির হাইব্রিড সভায় যুক্ত হন। তাঁদের সভায় যুক্ত করেন কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাঈদ আহমেদ। তিনি নিজেও কোম্পানির একজন শেয়ারধারী। ৬৫তম সভার আগে পরিচালনা পর্ষদের ৬৪তম সভার কাগজপত্রের ভিত্তিতে সাঈদ আহমেদকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) থেকে ভারপ্রাপ্ত এমডি করা হয়। যদিও ৬৪তম পর্ষদ সভাকে ভুয়া সভা হিসেবে অভিহিত করে বিএসইসিতে অভিযোগ করেছেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ।
অভিযোগে বলা হয়, চেয়ারম্যান হিসেবে সাইকা মাজেদ এ সভার বিষয়ে কিছুই জানেন না। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নাভানা ফার্মার স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে সাইকা মাজেদকে নিয়োগ দিয়েছিল বিএসইসি। পরে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গত বছরের জুন থেকে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তাঁরা কোম্পানি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে কোম্পানিতে সাধারণ শেয়ারধারীদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। তাই আমরা সরকার ও বিএসইসির কাছ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছিসাইকা মাজেদ, চেয়ারম্যান, নাভানা ফার্মা
গত ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায়ও তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু তাঁর অজান্তেই ওই সভায় সাঈদ আহমেদের সহযোগিতায় অনলাইনে যোগ দেন ইতিপূর্বে পদত্যাগ করা তিন পলাতক পরিচালক ও আদনান ইমাম। ওই সভায় পুরোনো এসব লোকজনের অনুপ্রবেশের পর ওই দিন তড়িঘড়ি করে সভা শেষ করা হয়। পরে এ বিষয়ে বিএসইসিতে অভিযোগ দেন কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিএসইসি কোম্পানির একাধিক পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে শুনানিতে ডাকেন। বিএসইসির শুনানিতে কোম্পানিটির ২৮ জানুয়ারির পর্ষদ সভায় নানা অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে সাইকা মাজেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পদত্যাগ করা কয়েকজন সাবেক পরিচালকের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত এমডি সাঈদ আহমেদ এখন কোম্পানি পরিচালনা করছেন। তাঁরা ইতিমধ্যে কোম্পানি সচিবকে অফিস থেকে বের করে দিয়েছেন। আইটির নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতে। তাঁরা কোম্পানির ওয়েবসাইটে পরিচালনা পর্ষদও বদল করে ফেলেছেন। এসব ঘটনার প্রতিকার চেয়ে আমরা বিএসইসিতে অভিযোগ দিয়েছি। এখন বিএসইসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’
সাইকা মাজেদ আরও বলেন, ‘বর্তমানে তাঁরা কোম্পানি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে কোম্পানিতে সাধারণ শেয়ারধারীদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। তাই আমরা সরকার ও বিএসইসির কাছ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছি। সরকার ও বিএসইসির পক্ষ থেকে যদি অন্য কাউকেও কোম্পানিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।’
কোম্পানিটি গত কয়েক বছরে খুব ভালো ব্যবসা করেছে। তাতে কোম্পানি নিয়ে আবারও টানাহেঁচড়া শুরু হয়েছে। আমি কোনো পক্ষাবলম্বন না করে কোম্পানির স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে অনেকের বিরাগভাজন হাওয়ার মুখে পড়েছিসাঈদ আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত এমডি, নাভানা ফার্মা
বিএসইসি সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর কোম্পানিটির পালিয়ে যাওয়া সাবেক পরিচালকদের একটি অংশ আবারও ফেরার চেষ্টা করছেন। তারই অংশ হিসেবে কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজশে তাঁরা জোর করে পর্ষদ সভায় অংশগ্রহণ ও নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাই পুরো বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি কমিশন কোম্পানিটির ৬৪তম ও ৬৫তম পর্ষদ সভার কার্যকারিতাও সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। সেই সঙ্গে ওই দুই সভায় কী হয়েছিল, আইন অনুযায়ী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না, সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেগুলো আইনসংগত ছিল কি না, কোম্পানির পরিচালক বদল ও কর্মকর্তাদের নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথ ছিল কি না ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিশনের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির ৬৩তম সভায় যাঁরা পরিচালক ছিলেন তাঁদের পুনর্বহাল করেছে বিএসইসি।
জানতে চাইলে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত এমডি সাঈদ আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর যেসব পরিচালক পদত্যাগ করেছেন, তাঁদের পদত্যাগের বিষয়টি ব্যাংকের আপত্তির কারণে আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। তাই তাঁরা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন এবং কোম্পানির বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে চাইলে পর্ষদ সভায় তাঁদের যুক্ত করা হয়েছিল। নিয়ম মেনেই ৬৪তম ও ৬৫তম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোম্পানি সচিবের স্বাক্ষরও রয়েছে তাতে।
সাঈদ আহমেদ আরও বলেন, ‘কোম্পানি গত কয়েক বছরে খুব ভালো ব্যবসা করেছে। তাতে কোম্পানিটিকে নিয়ে আবারও টানাহেঁচড়া শুরু হয়েছে। আমি কোনো পক্ষাবলম্বন না করে কোম্পানির স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে অনেকের বিরাগভাজন হওয়ার মুখে পড়েছি। কোম্পানিতে আমিই ওষুধ খাতের একমাত্র বিশেষজ্ঞ উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারী।’
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, নাভানা ফার্মার সাবেক পরিচালক আনিসুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামানের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবে বেসরকারি ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অনিয়মবিষয়ক মামলায় স্থগিত রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ইউসিবি পরিচালিত হয়েছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরীসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নির্দেশনায়। এ সময়ে ব্যাংকটিতে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও আনিসুজ্জামানসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটিতে নানা আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় অভিযুক্ত।
এদিকে তদন্তের উদ্যোগের বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে কোম্পানিটি “জোর করে দখলের” চেষ্টা চলছে। তাই আমরা পুরো ঘটনা তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ইসলাম গ্রুপের কাছ থেকে ২০২০ সালে নাভানা ফার্মা কিনে নেন আনিসুজ্জামান চৌধুরীসহ তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত বেশ কয়েকজন। তারপর নতুন করে কোম্পানিটিকে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন তাঁরা। ২০২২ সালে এটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসা নাভানা ফার্মা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারের ২৮ শতাংশ রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।