মুনাফায় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। গত বছর শেষে সিটি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের চেয়ে ৩১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। রেকর্ড মুনাফা করায় ১৫ বছর পর আবারও শেয়ারধারীদের ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় গত বছরের আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পর্ষদ সভা শেষে ব্যাংকটি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে মুনাফা ও লভ্যাংশের এ তথ্য প্রকাশ করে। তা থেকে ব্যাংকটির রেকর্ড মুনাফার এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সিটি ব্যাংক জানিয়েছে, গত বছর শেষে ব্যাংকটির সমন্বিত মুনাফা করেছে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। ব্যাংক ও তার সহযোগী ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এ মুনাফা করেছে। আর এককভাবে গত বছর শেষে সিটি ব্যাংকের মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির একক মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। ওই বছর ব্যাংকটির অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত সমন্বিত মুনাফা কমে ১ হাজার ১৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে তৃতীয় ব্যাংক হিসেবে সিটি ব্যাংক গতকাল তাদের গত বছরের চূড়ান্ত মুনাফার হিসাব প্রকাশ করেছে। এর আগে প্রাইম ব্যাংক ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক তাদের গত বছরের মুনাফার তথ্য বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রকাশ করে। এই তিন ব্যাংক গত বছরের মুনাফার যে হিসাব দিয়েছে, তাতে তিনটি ব্যাংকই গত বছর শেষে রেকর্ড মুনাফা করেছে। এর মধ্যে প্রাইম ব্যাংক ৯১০ কোটি টাকা, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ৩৬৮ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা করে গত বছর।
ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপ, নানা সংকটের মধ্যেও গত বছরটি ছিল ব্যাংক খাতের জন্য ব্যবসার ভালো বছর। ভালো ব্যাংকগুলো এ বছর রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করেছে। যেসব ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল, আস্থার সংকটে পড়তে হয়নি যাদের, সেসব ব্যাংকই মূলত ভালো ব্যবসা করতে পেরেছে। এ কারণে বছর শেষে ভালো ব্যাংকগুলো রেকর্ড মুনাফার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকটি ঋণের সুদ বাবদ আয় করেছে ৫ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণের সুদ বাবদ ব্যাংকটির আয় বেড়েছে ৯৭০ কোটি টাকা বা প্রায় ২২ শতাংশ। গত বছর ব্যাংকটি আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় করেছে ৫ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৭ কোটি টাকা।
সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমানতের সুদ বাবদ ব্যাংকটির খরচ বেড়েছে ২ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা বা ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণের সুদ বাবদ ব্যাংকটির আয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে আমানতের সুদ বাবদ ব্যয়। এ কারণে বছর শেষে সুদ আয় থেকে সুদ ব্যয় বাদ দেওয়ার পর ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় দাঁড়ায় ২৮৫ কোটি টাকায়। তারপরও বছর শেষে ব্যাংকটি রেকর্ড মুনাফা করেছে।
তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগ, বিভিন্ন সেবার বিপরীতে প্রাপ্ত মাশুল, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ আয়। এ খাত থেকে ব্যাংকটি গত বছর আয় করেছে ৪ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে শুধু সরকারি বিভিন্ন বিল–বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। আগের বছর ব্যাংকটি বিনিয়োগ থেকে আয় করেছিল ১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা বা ১১৪ শতাংশ, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। আর সেই আয়ের ওপর ভর করে বড় অঙ্কের রেকর্ড মুনাফা করেছে সিটি ব্যাংক।
সার্বিক বিচারে মন্দার সময়েও সিটি ব্যাংক অনেক ভালো করেছে। আমাদের ভোক্তা (রিটেইল) ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাইক্রোফিন্যান্স ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও ডিজিটাল ন্যানো লোন পোর্টফোলিওতে মন্দ ঋণ একদমই নগণ্য। এটা আমাদের বড় শক্তির জায়গা।মাসরুর আরেফিন, এমডি, সিটি ব্যাংক
এদিকে গত বছরের জন্য ব্যাংকটি শেয়ারধারীদের ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বাবদ ব্যাংকটির খরচ হবে ২২৮ কোটি টাকার বেশি। এর আগে সর্বশেষ ২০১০ সালে ব্যাংকটি শেয়ারধারীদের ৩০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। এর ১৫ বছর পর গত বছরের জন্য ব্যাংকটি আবারও নগদ ও বোনাস মিলিয়ে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘গত বছর সিটি ব্যাংক এককভাবে মুনাফা করেছে ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। আর সহযোগী কোম্পানি মিলে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এই মুনাফা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। তার আগের বছর এই মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৪ কোটি টাকা। তার মানে এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৩১ শতাংশ। এটা বর্তমান অবস্থায় অনেক ভালো প্রবৃদ্ধি। মুনাফা আসলে দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। তবে আমরা মন্দ ঋণের বিপরীতে বেশি প্রভিশন রাখার পক্ষপাতী। আমাদের প্রভিশন কভারেজ রেশিও এখন ১২৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে মোট প্রভিশন ব্যয় ছিল ৬২৯ কোটি টাকা, যা গত বছর দাঁড়িয়েছে ৮১৫ কোটি টাকা। আমরা বছর শেষ করেছি মাত্র আড়াই শতাংশ শ্রেণীকৃত ঋণ (এনপিএল) রেশিও নিয়ে।
সিটি ব্যাংকের এমডি আরও বলেন, সার্বিক বিচারে মন্দার সময়েও সিটি ব্যাংক অনেক ভালো করেছে। আমাদের ভোক্তা (রিটেইল) ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাইক্রোফিন্যান্স ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও ডিজিটাল ন্যানো লোন পোর্টফোলিওতে মন্দ ঋণ একদমই নগণ্য। এটা আমাদের বড় শক্তির জায়গা।