শেয়ারবাজারে শেয়ারের বিপরীতে দেওয়া মার্জিন লোন বা ঋণের লাগাম টানা হচ্ছে। এখন থেকে শেয়ারবাজারের ভালো মৌলভিত্তির ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানি ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণির কোম্পানির শেয়ারে ঋণ দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া শেয়ার কেনার ঋণ পেতে হলে একজন বিনিয়োগকারীর ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা নিজস্ব বিনিয়োগ থাকতে হবে। এমন সব বিধান যুক্ত করে শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনার জন্য বিনিয়োগকারীদের মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর দেওয়া ঋণকে মার্জিন লোন (ঋণ) বলা হয়। বিষয়টি এ রকম, নিজের টাকায় একটি শেয়ার কিনলে আপনাকে আরেকটি শেয়ার কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হবে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা যায়, খসড়া বিধির ওপর অংশীজনদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংযোজন–বিয়োজনের পর তা চূড়ান্ত করা হবে। তবে মার্জিন ঋণসংক্রান্ত খসড়া বিধির কিছু ধারা নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁরা বলছেন, এসব ধারা বলবৎ থাকলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর কিছু ধারা মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ কার্যক্রমকে জটিল করবে। তাই তাঁরা এসব ধারা বাতিল বা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
খসড়া বিধিমালার কিছু ধারা নিয়ে আমাদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। কিছু ধারা বাস্তবভিত্তিক নয় বলে আমাদের প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। আমরা খসড়া বিধিমালাটি সদস্যদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করছি। সদস্যদের মতামত পাওয়ার পর আমরা কিছু সুপারিশ করব।— মাজেদা খাতুন, সভাপতি, বিএমবিএ।
এদিকে ১৯ আগস্ট খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু শেয়ারের দামে নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, অংশীজনদের মতামত পাওয়ার পর তা যাচাই–বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনের পর বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
শেয়ারবাজারে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক—এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান শেয়ার কেনার বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিয়ে থাকে। ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ঋণসংক্রান্ত খসড়া বিধির বিষয়ে তাদের আপত্তির কথা ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ডিবিএর মাধ্যমে কমিশনে জমা দেওয়া হবে। আর মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর আপত্তি তাদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) মাধ্যমে কমিশনে জমা দেওয়া হবে।
খসড়া বিধির কিছু ধারা নিয়ে সদস্যদের ভিন্ন মত রয়েছে। কিছু ধারা বাস্তবসম্মত নয়। সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সেগুলোর বিষয়ে আমাদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসইসিকে জানাব। আশা করছি, সেসব ধারা সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে বিধিটি চূড়ান্ত করা হবে।—সাইফুল ইসলাম, সভাপতি, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)।
খসড়া বিধিমালা কার্যকর হলে কয়েকটি ধারার কারণে ঋণে লাগাম পড়বে। তার মধ্যে অন্যতম, ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির বাইরে অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারে ঋণ দেওয়া যাবে না। ৩০–এর বেশি পিই রেশিওর শেয়ারের ঋণ দিতে পারবে না ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে ৪০–পিই রেশিও পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যায়। এ ছাড়া আনরিয়ালাইজড গেইন বা কাগুজে মুনাফার বিপরীতে কোনো ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে না। আবার ঋণ পেতে হলে ন্যূনতম বিনিয়োগ থাকতে হবে ৫ লাখ টাকা। শেয়ারের বিপরীতে সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ অনুপাত ১। অর্থাৎ নিজের ১০০ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা ঋণ নেওয়া যাবে। এসব ধারার কারণে ঋণের পরিমাণ ও ঋণযোগ্য কোম্পানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমবে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে শেয়ারবাজারে ঋণযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা এক শর নিচে নেমে আসবে। এতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি যেমন কমবে তেমনি ঋণজনিত বাজার ঝুঁকিও কমবে।
তবে খসড়া বিধিমালার একটি ধারা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি অংশীজনদের। সেটি হচ্ছে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোম্পানির মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ও সংশ্লিষ্ট খাতের পিই রেশিও সীমা ৩০–এ নির্ধারণসংক্রান্ত। প্রস্তাবিত ওই ধারায় বলা হয়েছে, যেসব কোম্পানির পিই রেশিও ৩০ বা তার বেশি, সেসব কোম্পানির শেয়ারে ঋণ দেওয়া যাবে না। এর সঙ্গে আরও একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, কোম্পানি এবং কোম্পানিটি যে খাতের, সেই খাতের পিই রেশিওর মধ্যে যেটি কম, সেটিকে বিবেচনায় নিতে হবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে। ধরা যাক, ‘এ’ কোম্পানির পিই রেশিও ২০। প্রস্তাবিত বিধি অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ার ঋণযোগ্য। কোম্পানিটি যে খাতের সেই খাতের সার্বিক পিইও রেশিও ১৫। সে ক্ষেত্রে ঋণযোগ্য কোম্পানি হওয়ার পরও ‘এ’ কোম্পানির শেয়ারে ঋণ দিতে পারবে না ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এই ধারাকে বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, যেসব ধারা নিয়ে আপত্তি রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে সম্মিলিত ও এককভাবে মতামত দেবে অংশীজনেরা। জানতে চাইলে ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মার্জিন ঋণের খসড়া বিধির কিছু ধারা নিয়ে সদস্যদের ভিন্ন মত রয়েছে। কিছু ধারা বাস্তবসম্মত নয়। সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সেগুলোর বিষয়ে আমাদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসইসিকে জানাব। আশা করছি, সেসব ধারা সংযোজন–বিয়োজনের মাধ্যমে বিধিটি চূড়ান্ত করা হবে। মোটাদাগে খসড়া বিধির বেশির ভাগ ধারার সঙ্গে আমরা একমত। আমরা চাই মার্জিন ঋণসংক্রান্ত পরিবর্তন হবে বাস্তবসম্মত ও আন্তর্জাতিক প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী।’
খসড়া বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো বিনিয়োগকারী ঋণ হিসাব খুলতে চাইলে তাঁকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ঋণ আছে কি না, সে–সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে। ওই ঘোষণাপত্র যাচাই–বাছাই না করে কোনো ঋণ হিসাব খুলতে পারবে না ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু অংশীজনেরা বলছেন, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই ধরনের তথ্য যাচাই–বাছাইয়ে কোনো ব্যবস্থা বর্তমান বাজারে নেই। এটি করতে হলে ঋণ নেওয়া বিনিয়োগকারীদের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং সেখানে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশাধিকার দিতে হবে যেমনটি ব্যাংকঋণে সিআইবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রয়েছে।
খসড়া বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, ‘এ’ শ্রেণির কোনো কোম্পানির শেয়ারে ঋণ দেওয়ার পর সেটির শ্রেণিমানের অবনতি হলে বা ‘এ’ থেকে ‘বি বা জেড’ শ্রেণিতে নেমে গেলে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে ওই শেয়ার ফোর্সড সেল করতে হবে। অংশীজনেরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে যখন ঋণদাতা অনেক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে শেয়ার বিক্রি করতে যাবে, তখন ক্রেতা পাওয়া যাবে না। তাই এই সময় বাড়ানো দরকার বলে মনে করছে তারা।
এ বিষয়ে বিএমবিএ সভাপতি মাজেদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘খসড়া বিধিমালার কিছু ধারা নিয়ে আমাদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। কিছু ধারা বাস্তবভিত্তিক নয় বলেও আমাদের প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। আমরা খসড়া বিধিমালাটি সদস্যদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করছি। সদস্যদের মতামত পাওয়ার পর আমরা কিছু সুপারিশ করব।’