ভালোর চেয়ে মন্দ ব্যাংক বেশি শেয়ারবাজারে

শেয়ারবাজারে এখন ভালোর চেয়ে মন্দ ব্যাংকের সংখ্যাই বেশি। গতকাল রোববার এক দিনেই ১০টি ব্যাংক নতুন করে দুর্বল মানের জেড শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় পুরো ব্যাংক খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আস্থার সংকটে পড়েছেন। গত বছর শেষে শেয়ারধারীদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব ব্যাংককে জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়। তাতে এ খাতের তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর অর্ধেকের বেশি দুর্বল ব্যাংক হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হয়ে গেল। ফলে এসব ব্যাংকের শেয়ারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক বাজারে।

শেয়ারবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, পরপর দুই বছর তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ না দিলে সেসব কোম্পানিকে দুর্বল মানের কোম্পানি হিসেবে জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়। আর জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির শেয়ার যাতে বিনিয়োগকারীরা কিনতে আগ্রহী না হন, সে জন্য এসব শেয়ারের বিপরীতে ঋণসুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি এসব শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতে ভালো ও মাঝারি মানের কোম্পানির চেয়ে এক দিন বেশি সময় লাগে। শেয়ারবাজারে সেই নিয়মের ফাঁদে পড়েছে নতুন করে আরও ১০টি ব্যাংক। এগুলো হলো এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক বা ইউসিবি, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ও এনআরবিসি ব্যাংক। আগে থেকেই শেয়ারবাজারে দুর্বল মানের ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সাউথবাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স বা এসবিএসি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক। আগের সেই ৫টি ব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে আরও ১০টি ব্যাংক যুক্ত হয়ে এখন শেয়ারবাজারে দুর্বল মানের ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে।

এর বাইরে অত্যন্ত দুর্বল মানের ব্যাংকে পরিণত হওয়ায় পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। কারণ, এসব ব্যাংকের শেয়ারের মান শূন্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের নেওয়া উদ্যোগ হিসেবে বর্তমানে ওই পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংক হচ্ছে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। জেড শ্রেণিভুক্ত ১৫টি ও লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়া ৫টি ব্যাংক মিলিয়ে শেয়ারবাজারের মোট ২০টি ব্যাংক এখন দুর্বল মানের ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৩৬। সেই হিসাবে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্ধেকের বেশি বা ৫৫ শতাংশই এখন দুর্বল ব্যাংক হিসেবে শ্রেণিভুক্ত।

দুই গতির ব্যাংক খাত

দেশের ব্যাংক খাতে গত বছর একদিকে মুনাফার রেকর্ড হয়েছে, অন্যদিকে একসঙ্গে ১০টির বেশি ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তাতে এক খাতের দুই গতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভালো মানের ব্যাংকগুলো মুনাফার ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ভালো মানের ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিনটি ব্যাংকের মুনাফা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক তিনটি হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে দেশি মালিকানার ব্যাংকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। সিটি ব্যাংকের মুনাফা ছাড়িয়েছে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মুনাফা। হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবের অপর সদস্য পূবালী ব্যাংক গত বছর শেষে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা করেছে। তালিকাভুক্ত ভালো মানের অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মুনাফাও গত বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি হওয়ায় ভালো ব্যাংকগুলো গত বছর শেষে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে।

একদিকে ভালো ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা, অন্যদিকে একসঙ্গে ১০টি ব্যাংকের দুর্বল মানের ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্তি—দুইয়ে মিলিয়ে ব্যাংক খাতে শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন। ফলে সার্বিকভাবে পুরো খাতের শেয়ারের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩৬ ব্যাংকের মধ্যে ১৫টি ভালো মানের ব্যাংক হিসেবে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত। এগুলো হলো ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক। আর মাঝারি মানের ব্যাংক হিসেবে ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত মিডল্যান্ড ব্যাংক।

কোথায় থেকে কোথায় নামল

শেয়ারবাজারে গতকাল নতুন করে যে ১০টি ব্যাংক জেড শ্রেণিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে ৬টি ভালো মানের ‘এ’ থেকে দুর্বল মানের ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউসিবি, আল আরাফাহ ও এনআরবিসি ব্যাংক। বাকি চারটি ব্যাংক মাঝারি মানে ‘বি’ শ্রেণি থেকে দুর্বল মানের ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। এই চারটি ব্যাংক হলো এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।

ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেসব ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র এখন সামনে উঠে আসছে। দেশের ব্যাংক খাতে বেশ কিছু ব্যাংকে টাকা রেখে টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। ফলে এসব ব্যাংক নতুন করে আমানত পেতেও হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের আস্থা কমে গেছে। এ কারণে ভালো ব্যবসা করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধান মেনে পুরোনো খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিং করতে গিয়ে কিছু ব্যাংকের মুনাফায় টান পড়েছে। যার পরিণতিতে এসব ব্যাংক শেয়ারধারীদের মুনাফা দিতে পারছে না। যার ভুক্তভোগী এখন শেয়ারের বিনিয়োগকারীরাও।

প্রভাব কী

নতুন করে গতকাল জেড শ্রেণিভুক্ত হওয়া ১০ ব্যাংকের মধ্যে ৮টিরই শেয়ারে দরপতন হয়েছে। দাম বেড়েছে একটির আর একটির দাম অপরিবর্তিত ছিল। জেড শ্রেণিভুক্ত বেশির ভাগ ব্যাংকের শেয়ারের দরপতনের প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংক খাতে। এ কারণে গতকাল ঢাকার বাজারে লেনদেন হওয়া ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ২১টির বা ৭০ শতাংশেরই দরপতন হয়। দাম বেড়েছে ৬টির আর অপরিবর্তিত ছিল ৩টির দাম। শেয়ারবাজারে সূচকের উত্থান-পতনে একক খাত হিসেবে ব্যাংক খাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এ কারণে ব্যাংক খাতের বেশির ভাগ শেয়ারের দরপতনে গতকাল ঢাকার বাজারে সূচকও কমেছে। এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে প্রায় ২১ পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ এক ব্যাংক খাতই গতকাল সূচককে টেনে নামিয়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে এই খাতের লেনদেনও।

ব্রোকারেজ হাউস লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজারের মোট লেনদেনের প্রায় সোয়া ২৪ শতাংশই ছিল ব্যাংক খাতের। গতকাল ১০ ব্যাংকের জেড শ্রেণিভুক্ত হওয়া ও তার প্রভাবে এই খাতের বেশির ভাগ শেয়ারের দরপতনে এদিন মোট লেনদেনে ব্যাংক খাতের অংশ কমে প্রায় ১৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ সার্বিক লেনদেনে ব্যাংক খাতের অংশগ্রহণ গতকাল দিনশেষে আগের দিনের ৮ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এদিন সূচকের পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখা ১০ কোম্পানির সব কটিই ছিল ব্যাংক।

শেয়ারবাজারে গতকাল সবচেয়ে বেশি কমেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারের দাম। এদিন ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ১ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৮ শতাংশের বেশি কমেছে। তাতে বৃহস্পতিবার যার হাতে ব্যাংকটির এক হাজার শেয়ার ছিল, তিনি গতকালের এই দরপতনে ১ হাজার শেয়ারে প্রায় ১ হাজার ৬৮০ টাকা লোকসান করেছেন।

বিশ্লেষকেরা কী বলছেন

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে আমরা একদিকে কিছু ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা দেখছি, অন্যদিকে কিছু ব্যাংক ধুকছে। ফলে এই খাতে স্পষ্টত একটা ভালো—মন্দের বিভাজন ফুটে উঠেছে। যেসব ব্যাংকের সুশাসন রয়েছে, খেলাপি ঋণ কম এবং যথেষ্ট তারল্য ছিল সেসব ব্যাংক খুব ভালো মুনাফা করেছে। আর যেসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে, খেলাপি ঋণ বেশি ও তারল্যসংকটে ভুগছে, সেসব ব্যাংক খারাপ করেছে। ফলে তারা শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তাই একসঙ্গে অনেক ব্যাংক এখন দুর্বল মানের জেড শ্রেণিভুক্ত হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়বে।’

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, শেয়ারবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগেই থেকেই ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা ছিল। তারা জানত কোন ব্যাংকগুলো ভালো করতে পারে আর কারা খারাপ করবে। তাই হঠাৎ খারাপ ব্যাংকগুলো জেড শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কিন্তু ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যাঁদের এই ধারণা ছিল না, তাঁদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

করণীয় কী

ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক খাতের ভালো-মন্দের বড় বিভাজন কমাতে হলে পুরো খাতের ওপর আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্বল পাঁচ ব্যাংকের একীভূত প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি একীভূত ব্যাংকটির দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়লে ব্যাংকগুলো প্রভিশনিংয়ের চাপ কমবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে ব্যাংকগুলোর সুশাসন। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থা না বাড়লে এসব ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত আমানত পাবে না। আর আমানত না পেলে তারল্যসংকটও কাটবে না।