বিক্রির জন্য সারি করে রাখা হয়েছে ব্যবহৃত গাড়ি
বিক্রির জন্য সারি করে রাখা হয়েছে ব্যবহৃত গাড়ি

গাড়ির সিএনজি ও এলপিজি রূপান্তরে খরচ কত, কোথায় করবেন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব দেশের জ্বালানি খাতেও পড়েছে। সরবরাহ কমে যাবে, ভেবে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যানবাহনে বেশি পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ সারি চোখে পড়ছে। তাই অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী জ্বালানি হিসেবে অকটেন ব্যবহারের বিকল্প পথ খুঁজছেন। এই বিকল্প পথ হচ্ছে গাড়িকে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) ও লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) কনভারশন বা রূপান্তর করা। এর ফলে খরচও কমে যায়।

একাধিক গাড়িবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অকটেনচালিত গাড়ির তুলনায় সিএনজি ও এলপিজির মাধ্যমে গাড়ির পরিচালন খরচ ৩০-৫০ শতাংশ কমে যায়। তবে গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি হয় মূলত অকটেন কিংবা ডিজেলের মতো জ্বালানি দিয়ে চালানোর জন্য। তাই সিএনজি ও এলপিজি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদি খরচ কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে খরচ বেড়ে যায়। তবে যাঁরা প্রতিদিন ৫০-১০০ কিলোমিটারের বেশি গাড়ি চালান, তাঁদের জন্য কনভারশন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

দেশে একসময় ব্যক্তিগত গাড়িতে সিএনজি কনভারশন জনপ্রিয় ছিল। তবে এখন ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ এলপিজি কনভারশনকেই বেছে নিচ্ছেন। এর কারণ সিএনজির চেয়ে এলপিজি ব্যবহার করে গাড়ি চালালে ইঞ্জিন তুলনামূলক ভালো থাকে। সিএনজির তুলনায় এলপিজি সিলিন্ডারের ওজনও কম। এ ছাড়া এলপিজিতে গাড়ি চালানো অনেকটাই অকটেনের মতো আরামদায়ক।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত গাড়ির সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান এইচএনএস অটো সলিউশন। প্রতিষ্ঠানটি গাড়ির সার্ভিসিংসহ সিএনজি ও এলপিজি কনভারশন সেবা দেয়। এইচএনএস অটো সলিউশনের অপারেশনের ব্যবস্থাপক দীপক কুমার সরকার বলেন, ‘বর্তমানে এলপিজি কনভারশনের চাহিদা বেশি। দেশে ২০টির বেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি চলে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ টয়োটা ব্র্যান্ডের। এর মধ্যে শুধু টয়োটা ব্র্যান্ডের গাড়ি এলপিজি ও সিএনজি কনভারশন করা যায়।’

কনভারশনে খরচ কত

সিএনজির তুলনায় এলপিজি কনভারশনে খরচ ধরনভেদে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি। এ ছাড়া কনভারশনের খরচ নির্ভর করে সিলিন্ডারের ব্র্যান্ড, ধারণক্ষমতা ও আকারের ওপর। প্রতিষ্ঠানভেদে দেশে গাড়ির সিএনজি ও এলপিজি কনভারশন করতে খরচ হবে ৬০ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে পুরোনো ও নিম্নমানের সিলিন্ডারের ব্র্যান্ড ব্যবহার করলে ৩০-৫০ হাজার টাকা খরচেও কনভারশন করা যাবে।

এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমেও সিএনজি কনভারশন করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্যমতে গাড়ির ধরন ও সিলিন্ডারের আকারভেদে প্রায় ২৯ হাজার টাকা থেকে ৬৯ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

দেশের অন্যতম গাড়ির সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপের অবস্থান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে। প্রতিষ্ঠানটি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, আউডি, রেঞ্জরোভারসহ সব ধরনের গাড়ির সার্ভিসিং সেবা দেয়। সে সঙ্গে সিএনজি ও এলপিজি কনভারশন সেবাও দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপের জানায়, ব্যক্তিগত গাড়িতে সিএনজি কনভারশন করাতে সিলিন্ডারের ব্র্যান্ড, ধারণক্ষমতা ও আকারভেদে ৭০-৯০ হাজার টাকা খরচ হবে। আর এলপিজি কনভারশন করতে খরচ হবে ৭৫-৯৫ হাজার টাকা।

মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপের নির্বাহী পরিচালক মাসুদ করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দেশে জ্বালানির সংকট শুরুর পর অনেক গ্রাহক এই কনভারশনের বিষয়ে জানার জন্য জানতে আসছেন। এ ছাড়া কনভারশনের চাহিদাও ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই কনভারশন প্রক্রিয়ায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়।

এই খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএনজির তুলনায় এলপিজি রিফুয়েলিং করতে অনেক কম সময় লাগে। এর ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। এ ছাড়া বর্তমানে এলপিজি স্টেশন ঢাকাসহ সারা দেশে পাওয়া যাচ্ছে। এলপিজিতে মাইলেজও প্রায় পেট্রলের সমপরিমাণ পাওয়া যায়।

আরেক প্রতিষ্ঠান সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডে সিএনজি ও এলপিজি কনভারশনে খরচ হবে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আরেক প্রতিষ্ঠান এইচএনএস অটো সলিউশনে এলপিজি ও সিএনজি কনভারশনে খরচ হবে ৬৫-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

এলপিজি ব্যবহারে খরচ কত?

এলপিজি ও সিএনজি কনভারশন সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যক্তিগত গাড়িতে অকটেন ব্যবহার করে চালালে প্রতি লিটার অকটেনে গাড়িভেদে ৮-১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত চালানো যায়। আর এক লিটার এলপিজিতে গাড়িভেদে ৮-১২ কিলোমিটার চলে। দেশে বর্তমানে ১ লিটার এলপিজির দাম প্রায় ৬২ টাকা। আর ১ লিটার অকটেন কিনতে খরচ হয় ১২০ টাকা।

সাউদার্ন অটোমোবাইলসের তেজগাঁও শাখার উপব্যবস্থাপক সুমন কুমার সরকার বলেন, অকটেনের চেয়ে সিএনজিতে গাড়ি চালালে খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়। আর এলপিজিতে চালালে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কম হয়।

রাজধানীতে প্রায় কয়েক শ ছোট–বড় এলপিজি ও সিএনজি কনভারশন সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপ, টোটাল সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি করভারশন ওয়ার্কশপ, সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেড ও নাভানা সিএনজি লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মিরপুর, বারিধারা, ভাটারা, তেজগাঁও, মগবাজার, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কিছু এলাকায় ছোট–বড় কনভারশন করার দোকান রয়েছে।