চলতি অর্থবছরের আর মাত্র তিন মাস আছে। আয়করের হিসাব হয় প্রতিবছরের জুলাই মাস থেকে পরবর্তী বছরের জুন মাস পর্যন্ত। আয়কর রিটার্নে আয়–ব্যয়, করছাড়, বিনিয়োগ পরিকল্পনা—সবই করতে হবে এই জুলাই–জুন চক্রের মধ্যে।
রিটার্ন জমার সময় শেষ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। এখন চলতি অর্থবছরের আয়–ব্যয়, করছাড় ও বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। বিনিয়োগ করে আপনি করছাড় পেতে পারেন। আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় করে আপনি যদি সরকার নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করেন, তা হলে আপনাকে বছর শেষে কম কর দিতে হবে।
আগামীবার রিটার্ন দেওয়ার সময় বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত নিতে হলে আপনার হাতে সময় আছে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাস।
এটাই বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত। অনেকেই জানেন না, এই বিনিয়োগ কোথায় কীভাবে করলে করছাড় পাওয়া যায়। হিসাব কীভাবে করতে হয় তা–ও বোঝেন না।
এবার হিসাবটি জানা যাক, বিনিয়োগ কোথায় করবেন, কীভাবে করছাড় নেবেন।
কোথায় বিনিয়োগ করবেন
করছাড় নিতে বিনিয়োগ করার জন্য ৯টি খাত আছে। সরকার তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এসব খাত ঠিক করে দিয়েছে। তার একটি হলো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। এখানে বিনিয়োগ করা তুলনামূলক সহজ ও লাভজনক। পাশাপাশি ঝুঁকি কম। এটি কর কমানোর বেশ জনপ্রিয় খাত।
অন্য খাতগুলো হলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চার কেনা; জীবনবিমার প্রিমিয়াম; সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা; স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে নিয়োগকর্তা ও কর্মকর্তার চাঁদা; কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমার তহবিলে চাঁদা; সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে চাঁদা; পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত যেকোনো সিকিউরিটিজ কেনা। আর ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলেও কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যাবে। ডিপিএসের ওপর বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ওপর এই করছাড় দেওয়া আছে।
নিয়ম কী
বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত নেওয়ার নিয়ম হলো মোট আয়ের দশমিক ০৩ শতাংশ; মোট অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ কিংবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হবে, তা–ই রেয়াতের পরিমাণ।
একজন করদাতার মোট আয়ের ওপর প্রযোজ্য করের চেয়ে যদি আইনানুগ রেয়াতের পরিমাণ বেশি হয়, তা হলে ওই করদাতা কোনো প্রকার কর রেয়াত প্রাপ্য হবেন না। কর রেয়াতের পরিমাণ কখনোই কর দায়ের বেশি হবে না।
করদাতার অবস্থান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় হলে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা, অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় হলে ন্যূনতম ৪ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশন ব্যতীত অন্যান্য এলাকায় হলে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা জাহিদ কবির এক বছরে বেতনভাতা, উৎসব বোনাসসহ সব মিলিয়ে ৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আয় করেছেন। পুরো বছরে ভবিষ্য তহবিল, কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমা তহবিলে চাঁদা দিয়েছেন ৪১ হাজার ৪০০ টাকা। এটি তাঁর বিনিয়োগ।
কর দায় গণনার হিসাব অনুসারে, প্রথম ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করহার শূন্য, অর্থাৎ কোনো কর দিতে হবে না। তাই জাহিদ কবিরের এই ১৪ হাজার টাকার ওপর নিয়ম অনুসারে ৫ শতাংশ হারে ৭০০ টাকা কর বসবে। বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত নেওয়ার নিয়ম অনুসারে জাহিদ কবিরের মোট আয়ের (৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা) দশমিক ০৩ শতাংশ হলো ১০ হাজার ৯২০ টাকা; মোট অনুমোদনযোগ্য হলো (৪১ হাজার ৪০০ টাকার ১৫ শতাংশ) ৬ হাজার ২১০ টাকা। বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা। এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে কম হলো ৬ হাজার ২১০ টাকা। যা জাহিদ কবিরের কর রেয়াতের পরিমাণ। আয়কর আইন অনুসারে, জাহিদ কবির ঢাকা সিটি করপোরেশনের করদাতা হিসেবে ন্যূনতম কর হিসেবে দিতে হবে ৫ হাজার টাকা। নিয়ম হলো কর রেয়াতের পরিমাণ কখনোই কর দায়ের বেশি হবে না।