সোনা
সোনা

কত ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা লাভজনক, ঝুঁকি কোথায়

সোনা এখন লাখ টাকার ধাতু। শুধু লাখ টাকা বললে একটু ভুলই হবে, তার কারণ বর্তমানে সোনার ভরি সোয়া দুই লাখ টাকার বেশি। দাম বেশি হওয়ায় মান নিয়ে অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকেন—কত ক্যারেটের সোনার গয়না কিনলে লাভজনক হবে, কোথা থেকে কিনলে ঠকবেন না ইত্যাদি।

বাংলাদেশ যে বছর স্বাধীন হয়, সে বছর সোনার ভরি ছিল ১৭০ টাকা। তারপর ৫৫ বছরে সোনার দাম ১ হাজার ৩৭০ গুণ বেড়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়ে হয়েছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। যদিও বর্তমানে দাম কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা।

দেশে ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতির সোনার অলংকার বিক্রি হয়। ক্যারেট হলো বিশুদ্ধতার মানদণ্ড। খাঁটি সোনা ২৪ ক্যারেট। ২২, ২১, ১৮ ক্যারেট বা সনাতনী পদ্ধতির সোনার সঙ্গে রুপা, তামা বা দস্তার মতো কম দামি ধাতুর মিশ্রণ থাকে। সোনার বিশুদ্ধতা বোঝাতে দুনিয়াজুড়ে সোনার গয়নায় নির্দিষ্ট চিহ্ন দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও থাকে। সেটিকে বলা হয় হলমার্ক।

বৈশ্বিক বাজারে ২৪ ক্যারেটের গয়নায় ২৪ কে বা ৯৯৯ খোদাই করা থাকে। মানে এটি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ। ২২ ক্যারেটের অলংকারে থাকে ৯১৬, যা কিনা ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ বিশুদ্ধতা বোঝায়। আবার ২১ ক্যারেটের গয়নায় সাধারণত ৮৭৫ লেখা থাকে, অর্থাৎ এটি ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিশুদ্ধ। এ ছাড়া ১৮ ক্যারেটে লেখা থাকে ৭৫০, অর্থাৎ এটি ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ।

একাধিক জুয়েলার্স মালিকেরা জানান, বাংলাদেশে ২১ ক্যারেটের সোনার অলংকার বেশি বিক্রি হয়। মেশিনে তৈরি চুড়ি, চেইন ও ব্রেসলেটের মতো অলংকার সাধারণত ২২ ক্যারেটের করা যায়। যেমন চুড়ি, চেইন ও ব্রেসলেট। তবে মেশিনেও ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অলংকার হয়। মূলত যেসব অলংকারে অনেক বেশি নকশা থাকে এবং ঝালাইয়ের প্রয়োজন হয়, সেগুলো ২১ ও ১৮ ক্যারেটের হয়ে থাকে।

কোন ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা লাভজনক, তা জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো ক্যারেটের সোনার অলংকার কিনতে পারেন। কম ক্যারেট মানে মান কম, এমন ধারণা ভিত্তিহীন। বিদেশে ৯ ক্যারেটের অলংকারও তৈরি হয়। যা–ই হোক, আপনি যে ক্যারেটের অলংকার কিনবেন, সেটি অবশ্যই হলমার্ক করা কি না, তা দেখে নেবেন। সেটি ক্যাশমেমোতে উল্লেখ আছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখবেন। জুয়েলার্স সমিতির সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে সোনার অলংকার কেনার পরামর্শও দিলেন তিনি।

দেশে হলমার্ক করা সোনার অলংকারের গায়ে কী লিখা থাকবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান—বাংলা গোল্ড ও ঢাকা গোল্ড হলমার্ক করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠান দুটি অলংকার পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় যে ক্যারেটের সোনা পাওয়া, সে অনুযায়ী অলংকারের গায়ে লেজার দিয়ে লিখে দেয়। পাশাপাশি একটি সনদও দেয় তারা। সেই সনদ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত থাকে।

জুয়েলারির মালিকেরা জানান, ঢাকার বাইরের অনেক ব্যবসায়ী টোনস মেশিন দিয়ে সোনার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করেন। সেটি প্রকৃত বিশুদ্ধতার কাছাকাছি তথ্য দিয়ে থাকে। ফলে সেটিও গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।

হলমার্ক করা অলংকার ও ক্যাশমেমো থাকলে গ্রাহকেরা প্রয়োজনে খুব সহজেই সোনার অলংকার বিক্রি করতে পারেন। পুরোনো অলংকার বিক্রির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ এবং পুরোনো অলংকার দিয়ে নতুন অলংকার তৈরির ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ বাদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

সোনার দাম বেড়ে যাওয়ার পর কম ক্যারেটের সোনা ও অন্য ধাতুর অলংকারের চাহিদা বাড়ছে। ব্রোঞ্জের সঙ্গে দুই থেকে তিন আনা সোনা দিয়ে তৈরি করে ব্রোঞ্জের ‘সোনার’ চুড়ি ও বালা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তবে সেই পণ্যে কি পরিমাণ সোনা দেওয়া হচ্ছে, সেটি পরিমাপ করার মাপকাঠি না থাকায় গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের জুয়েলারি দোকানে ব্রোঞ্জের সোনার চুড়ি ও বালা বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে জুয়েলার্স সমিতি। এই ধরনের পণ্য না কিনতে গ্রাহকদেরও অনুরোধ করেছেন সমিতির নেতারা।

এদিকে ঢাকার বাইরে দু–একটি এলাকার গুটিকয়েক জুয়েলারি দোকান মালিক জুয়েলার্স সমিতির নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে সোনার অলংকার বিক্রির প্রলোভন দেন। এমনকি অনলাইনে সোনার অলংকার বিক্রির চটকদার বিজ্ঞাপনও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। অনেকে অলংকার না দেখেই ক্রয়াদেশ দেন।

এ বিষয়ে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, জুয়েলার্স সমিতির নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি সোনার মানে কোনো না কোনো ঘাপলা করছেন। সে ক্ষেত্রে ওই বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আর অনলাইনে পণ্য কেনার আগে যাচাই-বাছাই করে দেখা দরকার। না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। যেহেতু সোনা এখন অনেক দামি ধাতু, তাই ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে অলংকার কিনুন।