ঢাকার সাভারের এসেন্সর ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার প্রোডাক্টস নামের প্রতিষ্ঠান চামড়ার ব্যাগ রপ্তানি করে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের সিংহভাগের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর পাল্টা শুল্ক আরোপের পর নতুন একটি মার্কিন ক্রেতার কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। তাতে গত বছর শেষে তাদের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক গত শুক্রবার অবৈধ ঘোষণা করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তারপর ভিন্ন আইনে সব দেশের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন বাজারে পণ্য রপ্তানি নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন এসেন্সর ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এম মুশফিকুর রহমান।
মুশফিকুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। তখন আমরা নতুন একটি মার্কিন ক্রেতার কাজ পেয়েছি। বর্তমানে আরেকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা চলছে। আমরা এই বাজারটি নিয়ে বেশ আশাবাদী। তবে নতুন করে শুল্ক জটিলতায় আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।’ তিনি বলেন, প্রতিযোগী সব দেশের শুল্ক যদি একই থাকে, তাহলে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে হয়।
মুশফিকুর রহমান ছাড়াও কয়েকজন রপ্তানিকারকের সঙ্গে গতকাল রোববার প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁদের ভাষ্য, শুল্ক নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা অবশ্যই দুশ্চিন্তার। পাল্টা শুল্ক অবৈধ হওয়ায় প্রতিযোগী সব দেশের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিযোগিতা বাড়বে। তারপরও বাংলাদেশের সুযোগ থাকবে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশ যাতে পিছিয়ে না যায়, তার জন্য নতুন সরকারকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সরকারের পর্যালোচনা করা উচিত হবে বলেও মনে করেন তাঁরা। আর বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে কৌশলে এগোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ৮ জুলাই সেটি কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায় বাংলাদেশ। তাতে পাল্টা শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। গত ৭ আগস্ট পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়।
পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার কমে হয় ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা গত শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরদিন শনিবার তা আরও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
নতুন শুল্ক, নতুন অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ২৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গন্তব্য ১৮ শতাংশ বা ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য। এই বাজারে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।
পাল্টা শুল্কের প্রস্তাবে শুরুতে বেকায়দায় থাকলেও পরে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায় বাংলাদেশ। তার কারণ, বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামের শুল্ক ছিল ২০ শতাংশ। তার বিপরীতে ভারতের পণ্যে মোট শুল্কহার ৫০ শতাংশ। চীনের শুল্ক আরও বেশি। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। কিন্তু গত শুক্রবার মার্কিন আদালতের আদেশের পর নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হলো।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, শুল্ক নিয়ে নতুন করে যে অস্থিরতা তৈরি হলো, তাতে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার কারণ, মার্কিন ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কিছুটা হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা যে চুক্তি করেছি, সেটি পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, দেশটিকে আমরা প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ফেলেছি।’
দুশ্চিন্তা আছে, সঙ্গে সুযোগও
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি ক্রয়াদেশ পাচ্ছিল। তার কারণ, উচ্চ শুল্ক থেকে বাঁচতে চীন থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক ভিয়েতনামে এবং ভিয়েতনাম থেকে মাঝারি মূল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ সরিয়ে আনছিল মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। ভারত থেকেও ক্রয়াদেশ স্থানান্তরিত হওয়ার ঘটনা বাড়ছিল।
জানতে চাইলে স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শোভন ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯ শতাংশের চেয়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ভালো। যদিও অনিশ্চয়তা থাকবে। তারপরও ভালোর দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর পণ্যের দাম বেড়েছিল। শুল্ক কমলে মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। তাতে পণ্যের চাহিদা ও রপ্তানি বাড়তে পারে।’ তিনি আরও বলেন, মার্কিন বাজারে শুল্কহার প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি থাকলেই বাংলাদেশের সুযোগ থাকবে। তার কারণ, চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরবেই। একই সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ইত্যাদিও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৮২০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের জুতা রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছে ২৫ কোটি ৫২ লাখ ডলারের জুতা।
চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এনপলি ফুটওয়্যার গত বছর ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের জুতা রপ্তানি করে। তার মধ্যে ১৫-১৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানি সেভাবে ছিল না। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর তিনটি নতুন মার্কিন ক্রেতার কাজ পেয়েছে এনপলি ফুটওয়্যার।
এ বিষয়ে এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুল্কহার পরিবর্তন হলে ক্রয়াদেশের প্রভাব পড়ে। মাঝে চীনা পণ্যে মার্কিন শুল্ক কমায় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দেওয়া স্থগিত করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও হয়তো কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সময় নেবে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে অনেক মার্কিন ক্রেতাই চীন থেকে ক্রয়াদেশের বড় একটা অংশ সরিয়ে আনবে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় খরচ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের সুযোগ ভালো। সে জন্য আমাদের স্বল্প মেয়াদে টিকে থাকতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।’
কৌশলে এগোতে হবে বাংলাদেশকে
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আপাতত অনিশ্চয়তা থাকবেই। সেটি মেনে নিয়েই ব্যবসা করতে হবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিকে কীভাবে সামলায় বাংলাদেশ। কারণ, চুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক ছাড় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, পাল্টা শুল্ক বাতিল হলেও ট্রাম্পের প্রশাসন চাইবে বাণিজ্যচুক্তির প্রতি সম্মান করবে বাংলাদেশ। নতুন সরকারের উচিত হবে চুক্তির খুঁটিনাটি মূল্যায়ন বা সংসদে আলোচনার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা।
এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে হইচই না করে কৌশলে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) যেসব দেশ চুক্তি করেছে, তারা কিন্তু চুপচাপ আছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।