আফগানিস্তানে এখন মানুষের জন্য দুবেলা দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সে জন্য তাঁরা ঘরের বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে দিচ্ছেন।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বাসিন্দা শুকরুল্লাহ। কিছুদিন ধরে হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই তাঁর। পরিবারের খাওয়া-পরার চিন্তায় দিশেহারা তিনি। সে জন্য একসময় শখের বশে কেনা কার্পেট বিক্রি করতে এসেছেন রাজধানীর চমন-ই হজরি এলাকায়। কিন্তু কার্পেট বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা জানেন না। কারণ, শুধু তিনি নন, তাঁর মতো শত শত আফগান কার্পেট, ফ্রিজ, কুশন, ফ্যান, বালিশ, কম্বল, রুপার বাসনকোসন, পর্দা, খাট, ম্যাট্রেস, হাঁড়িপাতিলসহ ঘরে থাকা বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতে চমন-ই হজরিতে ভিড় জমিয়েছেন। কারণ, এসব মানুষের কারোর হাতেই এখন সংসারের প্রাত্যহিক খরচ চালানোর মতো নগদ অর্থ নেই।
গত আগস্ট ও চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ আফগান নাগরিক যথেষ্ট খাবার পাচ্ছেন না।
গত ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের দখল নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়েছে সেটি হলো নগদ অর্থের সংকট। তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই একে একে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আন্তর্জাতিক তহবিলে আফগানিস্তানের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়।
তালেবানি যুগ শুরু হওয়ার পর এক মাস ধরে আফগানিস্তানে ব্যাংক বন্ধ করে রাখা হয়। এটিএম বুথেও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (দ্য আফগানিস্তান ব্যাংক) আর্থিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিলেও এখনো বেসরকারি অনেক ব্যাংক তাদের সব শাখা খোলেনি। যেসব শাখা খোলা হয়েছে, সেগুলোতে শত শত মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো থেকে সাপ্তাহিক অর্থ উত্তোলনের সীমা ২০০ ডলার বা ২০ হাজার আফগান মুদ্রায় নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু তা-ও যেন মিলছে না। তাই নগদ অর্থের জন্য ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। এসব জিনিসপত্র পানির দামে ছেড়ে দিতে চাইলেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
আফগান অর্থনীতি খুবই ছোট। দেশটির জনগণের মাথাপিছু আয় এখন মাত্র ৫১০ ডলারের কাছাকাছি। এককথায় সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি। কিন্তু শত শত ডলারের বৈদেশিক সাহায্য আসার পরও আফগানিস্তানের অর্থনীতি ধুঁকছে তো ধুঁকছেই। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। চাকরি দুষ্প্রাপ্য। গত জুলাই মাস থেকেই অনেক সরকারি কর্মচারী অবৈতনিকভাবে কাজ করছেন। এর মধ্যে নতুন সরকার গঠন করেছে তালেবান। যাঁদের হাতে অর্থনীতির হাল ধরার দায়িত্ব, তাঁদের কারোরই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই। অন্য দিকে বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটির ৯৪০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার সামান্য রিজার্ভও জব্দ করা হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে। আফগান মুদ্রার মানও কমে গেছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর আফগান অর্থনীতি বেশ বেকায়দায় পড়েছে।
* আগামী বছরে ৯৭% আফগান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। * শিগগির দেশজুড়ে ব্যাপক খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা। * খাদ্য কেনার মতো অর্থ মানুষের হাতে নেই।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালে তালেবানের বার্ষিক আয় ছিল ৪০ কোটি ডলার। তবে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের শেষের দিকে এসে তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। বছরে তা প্রায় ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তালেবানদের আয়ের এ উৎস হচ্ছে বৈদেশিক সহায়তা, মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও খনিজ সম্পদ।
তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এতে দারিদ্র্য ও অনাহার বেড়েছে, মানবিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানের ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিও (ডব্লিউএফপি) আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে চলতি মাসের শেষের দিকে দেশটিতে ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে দেড় কোটি মানুষ অনাহারে থাকার মতো মানবিক সংকটে পড়তে পারে।
সূত্র: সিএনবিসি, আল-জাজিরা ও রয়টার্স