দুই বছরে কমেছে ১০ শতাংশ

চীনে বিদেশি বিনিয়োগে ধস

বিশ্ব আর্থিক মন্দার পরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে চীন। দেশটির সরকার বিনিয়োগকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠাগুলোকে মূল্য কারসাজি ও একচেটিয়া আচরণের অভিযোগে মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করার পর থেকেই চীনে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমতে শুরু করে, যা এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার এক হিসাব দিয়ে বলেছে, চলতি বছরের আগস্টে চীনে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৭২০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০১০ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন।

এ ছাড়া গত বছরের আগস্টের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৪ শতাংশ। আবার ২০১২ সালের আগস্ট মাসে যে বিনিয়োগ
হয়েছে, তার তুলনায় ২০১৩ সালে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে দেশটিতে ১০ শতাংশের বেশি হারে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ভিত্তিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমে আসাকেই বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। চীনের দুই অঙ্কের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় খাত হলো দেশটির আবাসনশিল্প। এখানে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, এর পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি ও জরিমানা আদায়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে বিনিয়োগ বন্ধ রেখেছে।

জরিমানার শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মার্সিডিজ ও বিএমডব্লিউ, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট ও কোয়ালকম, বিভিন্ন ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও শিশুপণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান।

গত মাসে এসব জরিমানা আদায় করার জন্য চীনা সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স। পাশাপাশি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স বলছে, একচেটিয়া আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে এ ধরনের জরিমানা আদায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংস্থার সদস্য চীন এমনটি করতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন অর্থমন্ত্রী (ট্রেজারি সেক্রেটারি) জ্যাক লিউ কিছুদিন আগে চিঠি লিখে
চীনের উপরাষ্ট্রপতি ওয়াং ইয়াংকে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এভাবে জরিমানা আদায় না করতে অনুরোধ করেন। তা না হলে বিষয়টি চীনা-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে বেইজিংয়ে মার্কিন দূতাবাসের এক মুখপাত্র এ চিঠির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এসব অভিযোগের জবাবে চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, একচেটিয়া ব্যবসাবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানকে
জরিমানা করা হয়েছে, তার মাত্র ১০ শতাংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠান। তবে জরিমানার শিকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের কোনো জরিমানা করা হচ্ছে না।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে এই জরিমানা আদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক মন্দার সময়েও দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চীনে মোট বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ১১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।

এ বছর বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ হলো জাপানের বিনিয়োগ কমে আসা। পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপানের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে এবার দেশটি চীনে বিনিয়োগ কম করেছে। এ বছরের প্রথম আট মাসে চীনে জাপানি বিনিয়োগ কমেছে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার বিনিয়োগ কমেছে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত।

আর একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস