ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি, আর কারা আছেন শীর্ষ ১০–এ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। পরে ফেব্রুয়ারির শুরুতে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশে আনা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেন। এই শুল্কের ধাক্কা, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ভারতীয় রুপি চাপের মুখে পড়ে। গত এক বছরে রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ফোর্বসের ২০২৬ সালের ধনীদের তালিকায় দেখা গেছে, ভারতের বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতির সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ২২৯-এ পৌঁছেছে। আগের বছর যা ছিল ২০৫। শেয়ারবাজারে বিভিন্ন কোম্পানির নতুন তালিকাভুক্তি এবং বাজারের স্থিতিশীলতার কারণে ভারতে ধনীর সংখ্যা বেড়েছে।

২০২৫ সালে ভারতের শতকোটিপতিদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯৪১ বিলিয়ন বা ৯৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এ বছর তা বেড়ে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ধনীর মোট সম্পদ ৩৬৮ বিলিয়ন বা ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। গত এক বছরে তাঁদের সম্পদ প্রায় ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার বেড়েছে।

ভারতের দুই শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির সম্মিলিত সম্পদ গত এক বছরে ১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার বেড়েছে। গত বছর রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আম্বানি আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়েছেন। ভারতের শীর্ষ ধনী হিসেবেও অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি। তবে দুই বছর আগের মতো তিনি এখন আর ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিক, অর্থাৎ ‘সেন্টি-বিলিয়নিয়ার’ হতে পারেননি।

দেখা যাক, ফোর্বস ম্যাগাজিনের তালিকা অনুসারে ২০২৬ সালে ভারতের শীর্ষ ১০ ধনী কারা। এ হিসাব চলতি বছরের ১ মার্চের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

উদয় কোটাক, সম্পদ: ১৪.৪ বিলিয়ন, খাত: ব্যাংকিং

ছবি: রয়টার্স

ভারতের প্রভাবশালী ব্যাংকারদের একজন উদয় কোটাক। তিনি কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৫ সালে বিনিয়োগ ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরবর্তীকালে এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। ২০১৪ সালে আইএনজি ব্যাংকের ভারতীয় কার্যক্রম অধিগ্রহণের পর ব্যাংকটি যেমন দ্রুত বড় হয়েছে, তেমনি তার প্রভাবও বেড়েছে। ২০২৩ সালে অবসরের নির্ধারিত সময়ের চার মাস আগে উদয় কোটাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অ-নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাধাকিষান দামানি, সম্পদ: ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার, খাত: খুচরা বিক্রয়, বিনিয়োগ

মুম্বাইয়ের অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী রাধাকিষান দামানির মালিকানাধীন সুপারমার্কেট চেইন অ্যাভিনিউ সুপারমার্টস ২০১৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর তিনি ভারতের খুচরা বাণিজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন। ২০০২ সালে মুম্বাইয়ের উপশহরে একটি দোকান দিয়ে তাঁর এ ব্যবসা শুরু হয়। এখন সারা ভারতে ৪৩০টির বেশি আউটলেট আছে তাঁর। খুচরা ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি ও তাঁর ভাই ইন্ডিয়া সিমেন্টসে নিজেদের অংশীদারত্ব বিক্রি করেন।

কুমার বিড়লা, সম্পদ: ২১.১ বিলিয়ন ডলার, খাত: পণ্য

ভারতের প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি আদিত্য বিড়লা গ্রুপের চতুর্থ প্রজন্মের প্রধান কুমার মঙ্গলম বিড়লা। এই গোষ্ঠীর আয় প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। সিমেন্ট, বস্ত্র, অ্যালুমিনিয়াম, টেলিকম, আর্থিক সেবা, রংসহ নানা খাতে তাদের ব্যবসা আছে। ভারতের বাইরে ৪০টির বেশি দেশে গ্রুপটির কার্যক্রম আছে। এই গোষ্ঠীর মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে বিদেশ থেকে। ১৯৯৫ সালে বাবা আদিত্য বিড়লার মৃত্যুর পর মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি ব্যবসার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সম্প্রতি গয়না ও হোটেল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছেন তাঁরা।

দিলীপ সাংভি, সম্পদ: ২৫.৬ বিলিয়ন ডলার, খাত: ওষুধ

ভারতের শীর্ষ ওষুধ উদ্যোক্তাদের একজন দিলীপ সাংভি। তাঁর বাবা ছিলেন ওষুধ পরিবেশক। ১৯৮৩ সালে বাবার কাছ থেকে মাত্র ২০০ ডলার ধার নিয়ে সান ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরুতে মানসিক রোগের ওষুধ তৈরি করলেও কোম্পানিটি পরবর্তীকালে দ্রুত বিস্তৃত হয়। বর্তমানে এটি ভারতের সবচেয়ে দামি তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানি। তাদের আয়ের বড় অংশই আসে বিদেশের বাজার থেকে। ছোট বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সান ফার্মা বড় হয়েছে। ২০১৪ সালে র‍্যানব্যাক্সি ল্যাবরেটরিজ কিনে নেয় তারা। এটি ছিল সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ। সম্প্রতি দিলীপের ছেলে অলোক সাংভি প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হয়েছেন।

সাইরাস পুনওয়ালা, সম্পদ: ২৭ বিলিয়ন ডলার, খাত: টিকা উৎপাদন

সাইরাস পুনাওয়ালার বাবা ঘোড়ার আস্তাবল দেখাশোনা করতেন। তিনি ১৯৬৬ সালে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। আজ এটি বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ভারতের পুনে শহরে এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয়। তারা প্রতিবছর ১৫০ কোটির বেশি টিকা ডোজ উৎপাদন করে। কোভিডের টিকা উৎপাদন করে তারা বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করে। তাঁর ছেলে আদর পুনাওয়ালা কোভিড টিকা উৎপাদনে নেতৃত্ব দেন। সাইরাস আরও কিছু খাতে বিনিয়োগ করেছেন, যেমন পুনাওয়ালা ফিনকর্প ও রিটজ-কার্লটন হোটেল।

শিব নাদার, সম্পদ: ৩০.৯ বিলিয়ন, খাত: সফটওয়্যার

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পের পথিকৃৎ শিব নাদার ১৯৭৬ সালে পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে এইচসিএল প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে ক্যালকুলেটর ও মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করত এই কোম্পানি। বর্তমানে এইচসিএল টেকনোলজিস ভারতের অন্যতম বৃহৎ সফটওয়্যার কোম্পানি। ২০২০ সালে তিনি চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগ করে কন্যা রোশনি নাদার মালহোত্রাকে দায়িত্ব দেন। এখন তিনি ইমেরিটাস চেয়ারম্যান ও কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্বের ৬০টি দেশে তাদের কার্যক্রম আছে। সেই সঙ্গে তরুণদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে তারা। সম্পদ হস্তান্তর শুরু করেছেন তিনি। গত বছর এক বিনিয়োগ কোম্পানির কিছু শেয়ার কন্যা রোশনির কাছে হস্তান্তর করেন তিনি।

লক্ষ্মী মিত্তাল, সম্পদ: ২৫.৬ বিলিয়ন, খাত: ইস্পাত

বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত ও খনন কোম্পানি আর্কেলর মিত্তালের চেয়ারম্যান লক্ষ্মী মিত্তাল। তাঁর পরিবারেরও ইস্পাত ব্যবসা ছিল। তিনি প্রথমে মিত্তাল স্টিল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০০৬ সালে ফ্রান্সের আর্কেলরের সঙ্গে কোম্পানিটি একীভূত করেন। ২০২৫ সালে আর্কেলরমিত্তালের নিট আয় ছিল ৩১৫ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৩০ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে আর্কেলর ও নিপ্পন স্টিল ৫৯০ কোটি ডলারে এসার স্টিল অধিগ্রহণ করে। ২০২১ সালে তিনি প্রধান নির্বাহী পদ ছেড়ে দেন। তাঁর জায়গায় আসেন কন্যা আদিত্য মিত্তাল। তবে তিনি কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।

সাবিত্রী জিন্দাল, সম্পদ: ৩৯.১ বিলিয়ন ডলার, খাত: ইস্পাত

জিন্দাল গ্রুপের চেয়ারম্যান সাবিত্রী জিন্দাল। তিনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ওম প্রকাশ জিন্দালের স্ত্রী। ২০০৫ সালে ও পি জিন্দাল হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর গ্রুপের কোম্পানিগুলো চার ছেলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তাঁরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। সাবিত্রী জিন্দাল ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবায়ও সক্রিয়। তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখছেন। তিনি ভারতীয় শিল্পমহলে নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী প্রতীক।

গৌতম আদানি, সম্পদ: ৬৩.৮ বিলিয়ন, সম্পদ: অবকাঠামো

গৌতম আদানি

গৌতম আদানি ভারতের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী শিল্পপতি। তিনি আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান। বন্দর, বিদ্যুৎ, বিমানবন্দর, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত—এসব ক্ষেত্রে তাঁর বিনিয়োগ। গত এক দশকে তাঁর নেতৃত্বে আদানি গ্রুপের দ্রুত উত্থান হয়েছে। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কোম্পানির অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃত কার্যক্রমের মাধ্যমে আদানি ভারতের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে হিনডেনবার্গ প্রতিবেদনের পর তাঁর কোম্পানির শেয়ারের মূল্য অনেকটা কমে যায়। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদও কমে যায়।

মুকেশ আম্বানি, সম্পদ: ৯৯.৭ বিলিয়ন ডলার, খাত: বহুমুখী

মুকেশ আম্বানি ভারতের শীর্ষ ধনী। তিনি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। পেট্রোকেমিক্যাল, জ্বালানি, টেলিকম ও খুচরা বাণিজ্যে তাঁর বিনিয়োগ আছে। রিলায়েন্স জিও চালু করার মাধ্যমে তিনি ভারতের মোবাইল ডেটা বাজারে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। রিলায়েন্স রিটেইলের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে তিনি ভোক্তা বাজারের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভারতের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।