তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার এনার্জি, বাংলাদেশে বড় প্রভাব পড়ার শঙ্কা

ইরানের ড্রোন হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির বড় ভুক্তভোগী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গতকাল সোমবার ইরানের ড্রোন দুটি স্থাপনায় আঘাত হানে বলে জানিয়েছে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মেসাইয়েদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক এবং রাস লাফানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতার এনার্জির জ্বালানি স্থাপনায় এই হামলা হয়েছে।

এই হামলায় কেউ হতাহত না হলেও নিরাপত্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে এলএনজি ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করেছে কাতারএনার্জি। খবর আল–জাজিরা।

ড্রোন হামলায় কাতার এনার্জির রাস লাফান কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জি যে জ্বালানি রপ্তানি করে, সেই এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট এই কমপ্লেক্সেই অবস্থিত।

রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ নিউজ সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটি ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। ‘ফোর্স মাজ্যুর’ হলো এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি—যেমন ড্রোন হামলা—যে পরিস্থিতিতে কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারলেও তাদের দায়ী করা যাবে না। কেননা, এই ঘটনা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কাতার এনার্জির এই সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে, এ কথা বলাই বাহুল্য। এমনিতেই যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমজু প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে।

সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর তথ্য অনুযায়ী, প্রণালিতে এলএনজি ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল কমেছে ৮৬ শতাংশ। উভয় প্রান্তে প্রায় ৭০০টি জাহাজ আটকে আছে।

বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে প্রভাব কী হবে

এলএনজি বা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে কাতার বড় সরবরাহকারী। বৈশ্বিক রপ্তানি বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তারাই সরবরাহ করে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে।

সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে এশিয়ার বাজারে—বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে।

এদিকে প্রথম আলোর এক সংবাদে বলা হয়েছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদেশ থেকে এলএনজি থেকে আসছে ৯৫ কোটি ঘনফুট। গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে আমদানি বাড়িয়ে ১০৫ কোটি ঘনফুট করার কথা রয়েছে। আমদানি বাড়ানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং তৈরি হতে পারে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমবে। এতে রান্নায়ও ভোগান্তি হতে পারে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, এ বছর ১১৫টি কার্গো (জাহাজ) এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা।

আল–জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক হলেও তাদের আমদানির বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৪ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ফুয়েলস অব দ্য ফিউচারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম্যাকসিম সোনিন বলেন, কাতারএনার্জির সিদ্ধান্ত জ্বালানি বাজারে ‘অস্থিরতা’ তৈরি করবে। তবে ‘সংকট’ তৈরি হয়ে গেছে, সে কথা এখনই বলা যাবে না।

সোনিন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কাতার বা অন্যান্য জ্বালানিকেন্দ্রে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এলএনজি বাজারে স্বল্প মেয়াদে অস্থিরতা তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপে ২০২২ সালের গ্যাস–সংকটের পুনরাবৃত্তি হবে বলে আমি মনে করি না।’ অর্থাৎ রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপের রুশ তেল-গ্যাস নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তিনি সেই সংকটের কথা স্মরণ করছেন।

২০২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তাদের বিক্রি অনেকটা কমে গেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক; এরপরই আছে কাতার ও অস্ট্রেলিয়া।

কাতার এনার্জির উৎপাদিত এলএনজির ৮২ শতাংশ এশিয়ার বাজারে বিক্রি হলেও তাদের উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারেও চাপ তৈরি হবে। বাস্তবে কম সরবরাহ দিয়ে একই বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে হবে। ফলে দাম ইতিমধ্যে বেড়েছে। কাতার এনার্জির ঘোষণার পর সোমবার ডাচ ও ব্রিটিশ পাইকারি গ্যাসের ভিত্তিমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়ায় এলএনজির ভিত্তিমূল্য বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।

জিয়েম্বা বলেন, কাতার দীর্ঘ সময় উৎপাদনের বাইরে থাকলে তা অবশ্যই ভালো খবর নয়। তবে ইউরোপের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো, শীতকালের মূল সময় শেষ।

এদিকে সোমবার রয়টার্সকে ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মূল্যায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস সমন্বয় গ্রুপ বুধবার বৈঠকে বসবে। এই গ্রুপে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা থাকেন। তাঁরা ইউরোপে গ্যাস মজুত ও সরবরাহ নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করে সংকটকালে সমন্বিত পদক্ষেপ নেন।