
ফোর্বস ম্যাগাজিনের বৈশ্বিক ধনকুবেরদের তালিকায় সাধারণত পুরুষদেরই আধিপত্য দেখা যায়। এতে অতিধনী নারীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। অর্থাৎ নারী–পুরুষের সম্মিলিত তালিকায় বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার তথা শতকোটিপতিদের মধ্যে নারীরা নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রকাশিত চলতি বছরের তালিকায় ৩ হাজার ৪২৮ জন বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতির মধ্যে ৪৮১ জন নারী। এর মানে, সম্মিলিত তালিকায় স্থান পাওয়া শতকোটিপতিদের মধ্যে ১৪ শতাংশ নারী। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪০৬ জন, যা মোটের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
এদিকে চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের নারী বিলিয়নিয়ারদের তালিকা প্রকাশ করেছে ফোর্বস। তাতে দেখা যায়, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী হয়েছেন অ্যালিস ওয়ালটন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৩৪ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণে তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের শেয়ারের দাম গত ১ বছরে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ৬৪তম বছরে পা দেওয়া এই খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানটি নতুন সিইও জন আর্নারের নেতৃত্বে ভালো করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানিটির বাজার মূলধন এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারে উঠেছে।
ফরাসি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান লরিয়েলের উত্তরাধিকারী ফ্রাঁসোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স এবং শিল্পপতি ডেভিড কচের বিধবা স্ত্রী জুলিয়া কচ যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছেন। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি এবং ৮১ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ১২০ কোটি ডলার।
এবারের তালিকায় এক ধাপ নেমে পঞ্চম স্থানে চলে গেছেন জ্যাকুলিন মার্স। তিনি পোষা প্রাণীর খাবারের ব্যবসা করনে। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। তাঁকে হটিয়েই চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছেন চিলির ব্যবসায়ী আইরিস ফন্টবোনা। তাঁর পরিবার চিলির সবচেয়ে ধনী পরিবার। তামার খনির ব্যবসা আছে তাঁদের। আইরিসের সম্পদমূল্য ৫২ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ২৬০ কোটি ডলার। এই ব্যবসা মূলত আইরিসের স্বামীর ছিল।
শীর্ষ ১০ ধনী নারীর মধ্যে একমাত্র স্বপ্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা হলেন সুইজারল্যান্ডের জাহাজ খাতের ব্যবসায়ী রাফায়েলা আপন্তে–ডিয়ামন্ট। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৪৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার। তিনি আগে ৫ম স্থানে ছিলেন। এবার ষষ্ঠ স্থানে নেমে গেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, নিজ প্রচেষ্টায় সম্পদ গড়া ১২২ জন নারী বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতির মধ্যে তিনিই সবচেয়ে ধনী।
নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া অতিধনী নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে আছেন মার্কিন ব্যবসায়ী ডিয়ানে হেনড্রিকস। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮২ সালে স্বামী কেন হেনড্রিকসের সঙ্গে এবিসি সাপ্লাই প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ৯ লাখ ডলারের ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন এই দম্পতি। গৃহ নির্মাণসামগ্রীর ক্ষেত্রে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি সরবরাহকারী। ২০০৭ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন।
সবচেয়ে আলোচিত আত্মপ্রতিষ্ঠিত ধনী নারীদের মধ্যে নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়েছেন সংগীত তারকা বিয়ন্সে। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া আগের তালিকায় থাকা রিহানা (১০০ কোটি), সারা ব্লেকলি (১৪০ কোটি) ও টেইলর সুইফট (২০০ কোটি) আছেন।
নারী শতকোটিপতিদের তালিকায় নতুন মুখ হিসেবে আছেন ব্রাজিলের সাবেক নৃত্যশিল্পী লুয়ানা লোপেস লারা। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার। শেয়ারবাজার নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া প্রতিষ্ঠান কালসির সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনি। মাত্র ছয় বছরে এই স্টার্ট আপের বাজারমূল্য ১১ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২৯ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী আত্মপ্রতিষ্ঠিত নারী শতকোটিপতি। তাঁর আগে এই খেতাব ছিল এআইভিত্তিক কোম্পানি স্কেল এআইয় লুসি গুওর। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৪০ কোটি ডলার। তার আগে এই খেতাব ছিল টেইলর সুইফটের।
এদিকে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস (৩ হাজার ৩০ কোটি ডলার) এবং প্রয়াত গণিতভিত্তিক ট্রেডিং বিশেষজ্ঞ জিম সিমন্সের স্ত্রী মেরিলিন সিমন্স (৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলার) এবার শীর্ষ ১০ থেকে ছিটকে গেছেন।
নতুন তালিকায় ৭ম স্থানে আছেন ভারতের সাবিত্রী জিন্দাল ও তাঁর পরিবার। ইস্পাত খাতের এই ব্যবসায়ীর সম্পদমূল্য ৩৯ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৯১০ কোটি ডলার।
৮ম স্থান পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী মিরিয়ান আডেলসন অ্যান্ড ফ্যামিলি। তাঁর সম্পদমূল্য ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার।
৯ম স্থানে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান আবিগাইল জনসন। তাঁর সম্পদমূল্য ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২০ কোটি ডলার। এ ছাড়া ১০ম স্থানে আছেন চীনের ঝেং সুলিয়াং অ্যান্ড ফ্যামিলি। অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবসায়ী এই নারীর সম্পদমূল্য ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২০ কোটি ডলার।