প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো গ্রাফিকস
প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো গ্রাফিকস

তেলের দাম ১৫০ ডলারে উঠলে মন্দার ঝুঁকি আছে: ব্ল্যাকরকের প্রধান ল্যারি ফিংক

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছালে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী ল্যারি ফিংক।

ল্যারি বলেন, ইরান যদি ভূরাজনৈতিকভাবে হুমকি (পশ্চিমের জন্য) হিসেবে থেকে যায় এবং তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকে, বিশ্ব অর্থনীতিতে তার গভীর প্রভাব পড়বে। এতে জ্বালানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে। খবর বিবিসি।

সাক্ষাৎকারে ল্যারি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বুদ্‌বুদ তৈরি হয়নি। তবে এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে শ্রমবাজারে কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। তাঁর মতে, বর্তমানে অনেক মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির পেছনে ছুটছেন, অথচ প্রযুক্তিগত ও কারিগরি প্রশিক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর—দুটি বড় প্রবণতাই বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে ফিংকের মত।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দামে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ল্যারি ফিংকের মতে, এ সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি এখনই বোঝা কঠিন। তবে তিনি মনে করেন, দুটি চরম পরিণতির আশঙ্কা আছে।

প্রথমত, যদি সংঘাতের সমাধান হয় এবং ইরান আবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তেলের দাম যুদ্ধের আগের অবস্থার চেয়েও কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, তা না হলে তাঁর আশঙ্কা, বছরের পর বছর তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে, এমনকি ১৫০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়বে। ব্যাপক ও গভীর মন্দা হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ফিংকের পরামর্শ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দেশগুলোকে বাস্তববাদী হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সস্তা জ্বালানি নিশ্চিত করা, এটি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ব্যাহত হবে।

অর্থনৈতিক তৎপরতা কমছে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় মার্চ মাসে ইউরোজোন ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি কমেছে—বিভিন্ন জরিপে এমনটাই দেখা গেছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্রকাশিত এইচসিওবি ফ্ল্যাশ ইউরোজোন পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) মার্চ মাসে কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এই সূচকের মান ছিল ৫১ দশমিক ৯। মার্চে এই সূচকের মান দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫–এ। সূচক ৫০-এর ওপরে থাকলে প্রবৃদ্ধি বোঝায়, এর নিচে নামলে বোঝা যায়, সংকোচন হয়েছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের প্রধান ব্যবসা অর্থনীতিবিদ ক্রিস উইলিয়ামসন ফ্রান্স ২৪-কে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দাম দ্রুত বাড়ছে, একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইউরোজোনে স্থবিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি কম্পোজিট পিএমআইয়ের প্রাথমিক হিসাব মার্চে ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ৫১ দশমিক ৯; মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৪।

আজ তেলের দাম কমেছে

এদিকে আজ বুধবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম বেশ খানিকটা কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলছে, যদিও ইরান এ দাবি নাকচ করেছে।

আজ সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৬ ডলারে নেমে আসে। ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে ৮৭ দশমিক ২০ ডলারে নেমে আসে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে আলোচনা এখনো চলছে। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র যাদের সঙ্গে কথা বলছে, তারা দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। ট্রাম্পের এ কথায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

এর আগের দিন তেহরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খবরকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেন। একই সময় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে।

বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা এ পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানি শেলের প্রধান জানিয়েছেন, আগামী মাসেই ইউরোপে তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। আজ সকালে তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তা সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে হামলা শুরুর আগে তেলের যে দাম ছিল, এখন দাম তার চেয়ে এখনো অনেক বেশি।

এশিয়ার শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী

এ পরিস্থিতির মধ্যেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সূচকও প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। হংকং ও সাংহাইয়ের সূচকেও সামান্য উত্থান দেখা গেছে।