এবার নগদ অর্থে ওয়ার্নার ব্রাদার্স কিনতে চায় নেটফ্লিক্স

হলিউডের প্রযোজনা সংস্থা ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির স্টুডিও ও স্ট্রিমিং কিনতে এবার পুরোপুরি নগদ অর্থের প্রস্তাব দিয়েছে নেটফ্লিক্স; যদিও আগে তারা যে মূল্য প্রস্তাব করেছিল, সেই মূল্যেই তারা স্থির আছে। মোট মূল্য ৮২ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ২৭০ কোটি ডলারই রাখা হয়েছে।

বেশ কয়েক মাস ধরেই ওয়ার্নার ব্রাদার্স কেনা নিয়ে নেটফ্লিক্স ও প্যারামাউন্টের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এবার নগদ অর্থের প্রস্তাব দিয়ে নেটফ্লিক্স কার্যত সেই তৎপরতায় ইতি টানতে চায়। খবর রয়টার্সের

গতকাল মঙ্গলবার দাখিল করা নথি অনুযায়ী, নেটফ্লিক্স শেয়ারপ্রতি ২৭ দশমিক ৭৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই অর্থ নগদে পরিশোধের প্রস্তাব ওয়ার্নার ব্রাদার্সের পরিচালনা পর্ষদের সর্বসম্মত সমর্থন পেয়েছে।

বাস্তবতা হলো, বিনোদনের জগতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স অনেক জনপ্রিয় সিনেমা ও টিভি সিরিজ উপহার দিয়েছে। ‘গেম অব থ্রোনস’, ‘হ্যারি পটার’, ডিসি কমিকসের ‘ব্যাটম্যান’ ও ‘সুপারম্যান’–এর মতো জনপ্রিয় কনটেন্ট আছে তাদের। এ পরিস্থিতিতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স কিনতে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্যারামাউন্টের প্রতিযোগিতা চলছে।

এর অর্থ হলো, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মালিকানা নেটফ্লিক্সের হাতে গেলে এসব জনপ্রিয় কনটেন্ট নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে।

প্যারামাউন্টও কম চেষ্টাচরিত্র করছে না। প্রস্তাবের শর্ত পরিবর্তন করে এবং জোরালো প্রচারণা চালিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের তারা বোঝাতে চেয়েছে, তাদের প্রস্তাবই শ্রেষ্ঠ। তবে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডেভিড এলিসনের নেতৃত্বাধীন প্যারামাউন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। নেটফ্লিক্সের নগদ প্রস্তাব নিয়ে গতকাল মন্তব্য করেনি তারা।

সংবাদে বলা হয়েছে, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ভোটাভুটির জন্য ওয়ার্নার ব্রাদার্স বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সভা ডাকবে। স্ট্রিমিং জগতের এই বৃহৎ কোম্পানির ভাষ্য, এই সভা এপ্রিলের মধ্যেই হওয়ার কথা। নেটফ্লিক্সের সহপ্রধান নির্বাহী টেড সারান্ডোস বিবৃতিতে বলেন, তাঁরা যে নগদে অর্থ পরিশোধের নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় গতি আসবে, অর্থাৎ ভোটাভুটির সময় এগিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে নগদ চুক্তিতে আর্থিক নিরাপত্তাও বেশি পাওয়া যাবে।

গতকাল মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধের পর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের কথা থাকলেও প্রাথমিক লেনদেনে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম শূন্য দশশিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। প্যারামাউন্টের শেয়ারের দাম কমেছে ১ দশশিক ৯ শতাংশ। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের শেয়ারের দাম কমেছে  শূন্য দশশিক ৫ শতাংশ।

ওয়ার্নার ব্রাদার্সের পঞ্চম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী ও হ্যারিস ওকমার্কের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক অ্যালেক্স ফিচ রয়টার্সকে বলেন, দরপত্রযুদ্ধ এখানেই শেষ নয়। তাঁর কথায়, নতুন এই ঐকমত্যের কারণে চাপ আরও বেড়েছে। ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, নেটফ্লিক্স জয়ের ব্যাপারে প্রকৃত অর্থেই আন্তরিক। শেয়ারহোল্ডারদের ভোটাভুটি এগিয়ে আসার অর্থ হলো, প্যারামাউন্টকে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন স্পষ্টতই প্যারামাউন্টের দায়িত্ব, তারা যদি কাজটি শেষ করতে চায়, তবে আরও ভালো প্রস্তাব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্যারামাউন্ট প্রস্তাবিত মূল্য না বাড়ালে তাদের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, ওয়ার্নার ব্রাদার্স ইতিমধ্যেই এ প্রস্তাবকে অপর্যাপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। তুলনামূলকভাবে নেটফ্লিক্সের নগদে অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে তারা। তারা মনে করছে, এতে অনিশ্চয়তা ও ঋণের চাপ তুলনামূলকভাবে কম। সেই সঙ্গে ঋণমান ভালো এবং দেনার ঝুঁকিও কম।

নেটফ্লিক্সের সঙ্গে একীভূত হলে যৌথ কোম্পানিটির মোট ঋণ দাঁড়াবে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার; যেখানে প্যারামাউন্টের সঙ্গে একীভূত হলে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার। তবে বাজারমূল্যের দিক থেকে নেটফ্লিক্স অনেক এগিয়ে। তাদের বাজারমূল্য প্রায় ৪০২ বিলিয়ন বা ৪০ হাজার ২০০ কোটি ডলার; যেখানে প্যারামাউন্টের বাজারমূল্য মাত্র ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার।

এদিকে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন মিললেও মিডিয়া একীভূতকরণের বিষয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা আছে। সে কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকাও এই কেনাবেচায় বড় হয়ে উঠবে।

কী প্রভাব পড়তে পারে বিনোদনশিল্পে

চলচ্চিত্রশিল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এই একীভূতকরণের মধ্য দিয়ে বড় পর্দার গুরুত্ব কমে যাবে। নেটফ্লিক্স বড় পর্দায় চলচ্চিত্র মুক্তি দেবে না। অনেক কলাকুশলী কাজ হারাবে।

কিন্তু নেটফ্লিক্স এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, গত বছর তারা এ পর্যন্ত ৩০টি চলচ্চিত্র বড় পর্দায় মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে চলবে বা শুধু সেখানেই চলবে—এ ধারণার বিরোধী তারা। নেটফ্লিক্স মনে করে, এটা গ্রাহকবান্ধব নয়। খবর সিএনএনের

অন্যদিকে ওয়ার্নার ব্রাদার্স নেটফ্লিক্সের হাতে চলে গেলে ‘ব্যাটম্যান’, ‘হ্যারি পটার’, ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ ও ‘দ্য উইজার্ড অব ও জেড’–এর মতো চলিচ্চত্র তাদের হাতে চলে আসবে। সেই সঙ্গে ‘গেম অব থ্রোনস’–এর মতো মর্যাদাপূর্ণ টিভি সিরিজের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে আসবে। এর মধ্য দিয়ে যা হবে, তা হলো, ডিজনির পর নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী এইবিও ম্যাক্সের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে।