যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত, শুল্ক কমে হবে ৫০% থেকে ১৮%

সোমবার ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। এর বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য নিজ দেশের বাজারে প্রবেশের পথে বাণিজ্য–বাধা হ্রাস করবে, যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরে করে আসছে।

সাধারণত বড় কোনো ঘোষণা দেওয়ার জন্য নিজের মালিকানাধানী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের দ্বারস্থ হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প। এবারও তা–ই করেছেন তিনি। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ফোনালাপ হয়। ট্রাম্প বলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনবে; সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হলো, তারা ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে। এর আগে শনিবারই ট্রাম্প বলেছিলেন, ভারত ইরানের নয়, ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে। খবর রয়টার্সের

রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ‘অপরাধে’ ভারতীয় পণ্যে আরোপিত জরিমানাস্বরূপ ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেননি ট্রাম্প। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের সব ধরনের পণ্য আমদানিতে যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাহার করছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিও চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ভারতের নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরও তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে তিনি সে কথা বলেছেন। সরাসরি জরিমানা মওকুফের প্রসঙ্গ এড়িয়ে তাঁর মন্তব্য, ভারতকে মোট ১৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। সেটা হলে তিন প্রতিবেশী পাকিস্তান (১৯%), চীন (৩০-৩৫%) ও বাংলাদেশের (২০) চেয়েও কম হবে ভারতের ওপর আরোপ হতে চলা মার্কিন শুল্ক।

মনে রাখা দরকার, ভারতের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তার মধ্যো ২৫ শতাংশ হলো পাল্টা শুল্ক আর বাকি ২৫ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে রাশিয়ার তেল কেনার জরিমানাস্বরূপ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের পোস্টে লিখেছেন, ‘আজ আমার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে পেরে আনন্দিত। ভারতে তৈরি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে, এটা জেনে আনন্দিত। এই দারুণ ঘোষণার জন্য ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেক ধন্যবাদ। দুটি বৃহৎ অর্থনীতি ও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র একসঙ্গে কাজ করলে আমজনতা উপকৃত হয়। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার অনেক ক্ষেত্র তৈরি হয়।’

নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির জন্য তাঁর প্রচেষ্টার প্রতি ভারতের পূর্ণ সমর্থন আছে। দুই দেশের অংশীদারি অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছেন।

এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যহারে বেশি পণ্য কিনবে—মোদি সেই অঙ্গীকার করেছেন। এর অংশ হিসেবে ভারত ৫০০ বিলিয়ন বা ৫০ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন জ্বালানি—কয়লাসহ—আমদানি করবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য আগের চেয়ে বেশি করে কিনবে।

ভারত সম্পর্কে ট্রাম্প আরও বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক–বাধা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পদক্ষেপ নেবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় এসে পাল্টা শুল্ক আরোপ করার আগপর্যন্ত বিশ্বে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল ভারত। সে সময় ভারতের নীতিগত বা কাগুজে গড় শুল্কহার (সিম্পল অ্যাপ্লায়েড) ছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কার্যকর (ইফেকটিভ) শুল্কহার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ।

বিস্তারিত কিছু নেই

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ট্রাম্পের পোস্টে চুক্তি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এ শুল্কহার কার্যকর হওয়ার তারিখ, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধে ভারতের সময়সীমা, বাণিজ্যিক বাধা কমানোর রূপরেখা কিংবা কোন কোন মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার অন্য বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগের বাণিজ্যচুক্তিগুলোয় সাধারণত মার্কিন শিল্প খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে ভারতের ঘোষণায় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

এমকে গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা বলেন, এই চুক্তি হয়ে গেলে ভারত এশিয়ার অন্যান্য দেশের কাতারে চলে আসবে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের গড় শুল্কহার ১৫ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে। ভারতের শুল্কহার হবে ১৮ শতাংশ। তাঁর মতে, এতে ভারতের রপ্তানি ও রুপির ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

আনুষ্ঠানিকতা করা হয়নি

সোমবার বিকেল পর্যন্ত হোয়াইট হাউস থেকে এ পরিবর্তনগুলোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রেসিডেনশিয়াল ঘোষণা বা ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশ জারি করা হয়নি।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্রও রয়টার্সকে এ বিষয়ে বাড়তি তথ্য দেননি। অন্যদিকে অফিস সময়ের পর পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ভারতের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। ওয়াশিংটনে রাশিয়ার দূতাবাসও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।