
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হতে পারেননি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও হাউস স্পিকার কেভিন ম্যাককার্থি। অথচ সময় হাতে আছে আর মাত্র ১০ দিন। এর মধ্যে তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র ঋণখেলাপি হয়ে যেতে পারে, আর তাতে ধস নামতে পারে দেশটির অর্থনীতিতে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, গতকাল সোমবার বাইডেন ও ম্যাককার্থির বৈঠক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। তবে তাঁরা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
ঐকমত্য না হওয়ার কারণ দুই পক্ষের মতভেদ। ম্যাককার্থি চাইছেন, হোয়াইট হাউস কেন্দ্রীয় বাজেট কমাতে রাজি হোক। তবে বাইডেন মনে করছেন, ম্যাককার্থি এ ক্ষেত্রে কট্টরপন্থী। একই সঙ্গে বাইডেন নতুন করারোপের প্রস্তাব দিয়েছেন, যার সঙ্গে আবার ম্যাককার্থি একমত নন। সে কারণেই এই অচলাবস্থা।
তবে বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি চিন্তার মধ্যেই নেই। এখন অগ্রসর হওয়ার একটাই পথ, সেটা হলো, সদ্বিশ্বাসে দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।’
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সোমবার রাতেও আলোচনা আবার শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ম্যাককার্থি। আলোচনা হবে ক্যাপিটল হিলে।
সাংবাদিকদের ম্যাককার্থি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এখনো আমরা ঐকমত্যে আসতে পারি।’ কিন্তু বাজেট–ঘাটতি হ্রাসে বাইডেনের পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি একমত নন। বাইডেন চাইছেন, ধনীদের কর বাড়িয়ে এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর কর ফাঁকি দেওয়ার পথ বন্ধ করে ঘাটতি দূর করতে। কিন্তু ম্যাককার্থি তাতে রাজি নন, তিনি ২০২৪ সালের ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় বাজেটের ব্যয় কমাতে চান।
এদিকে বৈঠকে উপস্থিত থাকা রিপাবলিকান দলের প্রতিনিধি প্যাট্রিক ম্যাকহেনরি রয়টার্সকে জানিয়েছে, ঋণের সীমা বৃদ্ধি করতে বাজেট–বিষয়ক আংশিক ঐকমত্য হবে, এমন সম্ভাবনা নেই। চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কেউ কোনো বিষয়ে একমত হবে না।
তবে প্যাট্রিক ম্যাকহেনরি জানিয়েছেন, বৈঠকের আবহ ইতিবাচক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের সীমা বৃদ্ধির যেকোনো সিদ্ধান্ত সংসদের উভয় কক্ষে পাস হতে হবে। কিন্তু হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে আর সিনেট ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে।
বৈশ্বিক আর্থিক খাতের ভিত্তি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড। দেশটি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঠিক কী হবে, তা বলা কঠিন; যদিও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা আশঙ্কা করছেন, সে রকম পরিস্থিতিতে বিশ্বের ইকুইটি, ঋণ ও অন্যান্য বাজারে ব্যাপক টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
ওয়াল স্ট্রিটের নির্বাহীরা সতর্ক করেছেন যে ট্রেজারি বাজার ঠিকঠাক কাজ না করলে তার প্রভাব দ্রুত ডেরিভেটিভ, মর্টগেজ ও পণ্যবাজারে ছড়িয়ে পড়বে। এর কারণ, বাণিজ্য ও ঋণ সুরক্ষিত রাখতে যেসব ট্রেজারি জামানত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিনিয়োগকারীরা সেগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। যেসব বন্ডের ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়েছে, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেগুলোর বদলে অন্য জামানত দিতে বলা হতে পারে।
এমনকি স্বল্প সময়ের জন্যও যদি ঋণের সীমা লঙ্ঘিত হয়, বাজারে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। যেমন এতে ঋণের সুদহার বৃদ্ধির পাশাপাশি ইকুইটির মূল্য কমতে পারে, ঋণচুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ও স্বল্পমেয়াদি তহবিল বাজারে স্থবিরতা সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি, আর্থিক বাজার ও বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে এর নেতিবাচকভাবে প্রভাব পড়তে পারে।
মুডিস অ্যানালিটিকস বলেছে, ঋণের সীমা লঙ্ঘিত হলে স্বল্পমেয়াদি তহবিল বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে বিবিসির এক সংবাদে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন না যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত খেলাপি হবে।
বিনিয়োগ ব্যাংক প্যানমিউর গর্ডনের প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইমন ফ্রেঞ্চ বলেন, ‘শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্র যদি খেলাপি হয়, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট অনেকটা টি পার্টির মতো হয়ে যাবে।’ ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের কথা মাথায় রেখেই তিনি এ কথা বলেন।
টি পার্টি একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলন, যার শুরু ২০০৯ সালে। এর প্রবক্তারা কর কমানো এবং জাতীয় ঋণ ও ফেডারেল বাজেট কমিয়ে আনার মাধ্যমে সরকারের খরচ হ্রাস করার পক্ষপাতি।
সাইমন ফ্রেঞ্চ আরও বলেন, ঋণের সীমা বাড়াতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বেশি দিন আর ভাতা ও অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাবদ অর্থ পরিশোধ করতে পারবে না। তাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।