২০২৪ সালে বিশ্বের সমুদ্রবন্দরগুলো দিয়ে মোট ৭৪ কোটি ৩০ লাখের সমপরিমাণ শিপিং কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি হয়েছে মাত্র ২০টি বন্দর দিয়ে।
লয়েডস লিস্ট ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০২৫ ডেটাবেজের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই চিত্রে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত কনটেইনার বন্দরগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বন্দরগুলোর কার্যক্রম পরিমাপ করা হয়েছে ‘টিইইউ’ বা টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিটে। এটি বৈশ্বিক নৌপরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবহৃত একক।
বিশ্বের মোট কনটেইনারের ৪০ শতাংশের বেশি পরিবহন হয় চীনের বন্দর দিয়ে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থায় তারাই যে মূল চালিকা শক্তি, এ তথ্য থেকেই তা বোঝা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত ছয়টি বন্দরের মধ্যে পাঁচটিই চীনে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে সাংহাই বন্দর। বন্দরের সক্ষমতা দিয়ে বোঝা যায়, কোন দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা কতটা।
২০২৪ সালে সাংহাই বন্দর দিয়ে ৫ কোটি ১৫ লাখের বেশি টিইইউ পরিবহন হয়েছে। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দর। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে এ সময় পরিবহন হয়েছে এর চেয়ে ১ কোটির কম টিইইউ। নিচের সারণিতে ২০২৪ সালে বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৪ সালের কনটেইনার পরিবহনের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।
মালয়েশিয়ার প্রধান সমুদ্রবন্দর পোর্ট ক্লাং রাজধানী কুয়ালালামপুরের কাছাকাছি মালাক্কা প্রণালির তীরে অবস্থিত। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অবস্থানের কারণে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র। কনটেইনার পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পপণ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি-রপ্তানিতেও বন্দরের বড় ভূমিকা আছে। আধুনিক টার্মিনাল, উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থা ও মুক্তবাণিজ্য–সুবিধার কারণে পোর্ট ক্লাং মালয়েশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত জেবেল আলী বন্দর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র। পারস্য উপসাগর, এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে এটি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের পাশে গড়ে ওঠা জেবেল আলী ফ্রি জোন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও শিল্পকারখানার বড় কেন্দ্র। উন্নত অবকাঠামো, গভীর সমুদ্র টার্মিনাল ও দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থার কারণে বন্দরটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বেইজিংয়ের প্রধান সমুদ্র প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত তিয়ানজিন বন্দর উত্তর চীনের বৃহত্তম বন্দরগুলোর একটি। ভারী শিল্প, জ্বালানি ও কনটেইনার পরিবহনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরটি উত্তর-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক নৌপথে চীনের প্রভাব বাড়াতে সহায়তা করছে। উন্নত অবকাঠামো, রেল ও সড়ক সংযোগের কারণে এটি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম বন্দর বুসান উত্তর-পূর্ব এশিয়ার প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র। জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক নৌপথে এর অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত কনটেইনার টার্মিনাল, জাহাজ মেরামত–সুবিধা ও শক্তিশালী লজিস্টিক নেটওয়ার্কের কারণে এই বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি এই বন্দর।
পার্ল রিভার অঞ্চলে অবস্থিত গুয়াংঝু বন্দর দক্ষিণ চীনের শিল্প ও বাণিজ্যের প্রধান সমুদ্র প্রবেশদ্বার। এটি কনটেইনার পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি, গাড়ি ও শিল্পপণ্য আমদানি-রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের অভ্যন্তরীণ নদীপথ ও বৈশ্বিক নৌ–রুটের সংযোগস্থল হওয়ায় বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। সম্প্রতি অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এর সক্ষমতা আরও বেড়েছে।
চীনের শানতুং প্রদেশে অবস্থিত কিংদাও বন্দর উত্তর-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। এটি কনটেইনার, জ্বালানি ও ভারী শিল্পপণ্য পরিবহনে বিশেষভাবে পরিচিত। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কারণে বন্দরের কার্যক্রমে গতি আছে; একই সঙ্গে বন্দর হিসেবে এর কার্যকারিতাও অনেক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও কিংদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
হংকংয়ের কাছাকাছি অবস্থিত শেনজেন বন্দর চীনের প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের বড় রপ্তানি কেন্দ্র। পার্ল রিভার ডেল্টা অঞ্চলের শিল্পকারখানাগুলোর পণ্য এই বন্দরের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। ইয়ানতিয়ান, শেখৌ, চিওয়ানসহ একাধিক টার্মিনাল নিয়ে গড়ে ওঠা এই বন্দর উচ্চ দক্ষতা ও দ্রুত কার্গো ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচিত। ই-কমার্স ও প্রযুক্তিপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহেও এর গুরুত্ব বাড়ছে।
পূর্ব চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে অবস্থিত নিংবো-ঝৌশান বন্দর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গভীর সমুদ্রবন্দর। এটি চীনের উৎপাদনশিল্প ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। বিপুল পরিমাণ কার্গো ধারণক্ষমতা ও আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালের কারণে বন্দরটি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার সঙ্গে নিয়মিত নৌ–যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এটি বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মালাক্কা প্রণালির কৌশলগত অবস্থানের কারণে সিঙ্গাপুর বন্দর পূর্ব ও পশ্চিমের সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সংযোগকেন্দ্র। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্রগুলোর একটি, অর্থাৎ এই বন্দরে মালামাল এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তোলা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক জাহাজ বন্দরে নোঙর করে। উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও জ্বালানি সুবিধার কারণে বন্দরটি বৈশ্বিক নৌ–বাণিজ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর বড় অবদান রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত কনটেইনার বন্দর সাংহাই বন্দর। পূর্ব চীন সাগর ও ইয়াংসি নদীর মোহনায় অবস্থিত এই বন্দর। এ বন্দরের মাধ্যমে চীনের শিল্পাঞ্চল, রপ্তানি কেন্দ্র ও অভ্যন্তরীণ নদীপথ বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫ কোটির বেশি টিইইউ পরিবহন সামলানো এই বন্দর উচ্চমাত্রার অটোমেশন, গভীর সমুদ্র টার্মিনাল ও দ্রুত লজিস্টিক ব্যবস্থার জন্য পরিচিত। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চীনের কেন্দ্রীয় অবস্থান ধরে রাখতে সাংহাই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।