অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কোথায় কোথায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা

ইউরোপ—এই মহাদেশ একসময় বিশ্ব শাসন করলেও কালের বিবর্তনে সেই জায়গা নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আজকের মার্কিনদের আদি নিবাস মূলত ইউরোপেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের কয়েক শতকের কর্তৃত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়।

এর পর থেকে পৃথিবীর সব ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য। যত দিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, তত দিন তাদের প্রতিপক্ষ ছিল। সোভিয়েত পতনের পর সেই বাস্তবতাও নেই। পৃথিবী ক্রমে এককেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। যদিও সম্প্রতি গত কয়েক বছরে চীনের উত্থান এবং রাশিয়ার পুনরুত্থানে বিষয়গুলো অনেক জটিল হয়ে গেছে।

গত কয়েক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কেবল বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুমকি দিলেও ইউরোপ একরকম মুখ বুজে আছে। যদিও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতা করার জেরে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের আটটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরে এসেছেন। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি—নানা ক্ষেত্রেই এই নির্ভরতা। খবর আল-জাজিরা।

অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অংশীদারত্ব ও অভিন্ন স্বার্থের বন্ধন হিসেবে দেখা হলেও, এর অন্তর্গত অর্থনৈতিক বাস্তবতা ক্রমেই আরও জটিল ও অসম হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতার কারণে এমন একধরনের কাঠামোগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যার কারণে সম্পর্ক একদিকে হেলে পড়েছে।

বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তিগত সেবা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দিক থেকে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর মধ্যে আছে ক্লাউড সেবা, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্যাটেলাইট সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা। এসব খাতের অনেক ক্ষেত্রেই ইউরোপ মার্কিন প্রতিষ্ঠান, মানদণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর নির্ভর করে। ফলে যেকোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করে রেখেছেন।

বন্ড একধরনের বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠাকে অর্থ ঋণ দেন। এর বিনিময়ে তাঁরা নিয়মিত সুদ পান এবং মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরত পান—যিনি তখন বন্ডের মালিক থাকেন, তিনিই সেই আসল ফেরত পান। বন্ড আর্থিক বাজারে কেনাবেচা করা যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত বন্ড ইস্যুকারীকে প্রথম ক্রেতা নয়, বরং অন্য কোনো বিনিয়োগকারীকে অর্থ ফেরত দিতে হতে পারে। সাধারণত শেয়ারবাজারের তুলনায় বন্ডে মুনাফা কম হয়। কিন্তু সুবিধা হলো, এর ঝুঁকি কম, বিশেষ করে সরকারি বন্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড সারা বিশ্বেই বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, বিশ্বে বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম হলো যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক বৈরী হয়ে গেলে এই নিরাপদ বিনিয়োগও প্রবলভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে যেতে পারে। আশঙ্কা থাকে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মূলধন ফেরত নাও দিতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে যদি বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে একযোগে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি শুরু করতে পারেন। অনেক মানুষ একসঙ্গে বিক্রি করলে বন্ডের দাম পড়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর হাতে থাকা বন্ডের মূল্য কমে যাবে। পরিণামে ইউরোপেরই ক্ষতি।

এ ধরনের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হলেও একই সঙ্গে তা ইউরোপের বন্ডধারীদের জন্যও বড় সমস্যার কারণ হবে। তখন তারা এই ‘নিরাপদ’ বিনিয়োগ মাধ্যমের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারবে না। এত বড় অঙ্কের অর্থ সরানোর জন্য স্থিতিশীল বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, ‘এই (অর্থনৈতিক) নির্ভরশীলতা পারস্পরিক হলেও তা মূলত একদিকে হেলে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউরোপ মূলত বড় বাজার; শিল্প ক্ষেত্রে তাদের অংশীদার—এটা বাণিজ্যিক নির্ভরতা। কিন্তু ইউরোপের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে হোয়াইট হাউসে যিনিই থাকুন না কেন, ইউরোপের ওপর ওয়াশিংটন দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তার করতে পারে।

জ্বালানি–নির্ভরতা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইউরোপের জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাসের মূল উৎস ছিল রাশিয়া। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপ যেভাবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাতে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপে রুশ গ্যাস আমদানি ৭৫ শতাংশ কমে যায়। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি পায়।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপে মার্কিন এলএনজি আমদানি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২১ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে ৮১ বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে ইইউর মোট এলএনজি আমদানির ৫৭ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গ্যাস ব্যবহার না কমালে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের গ্যাস আমদানির ৭৫-৮০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসতে পারে, এই হচ্ছে বাস্তবতা।

প্রতিরক্ষা–নির্ভরতা

প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে। যুদ্ধের আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছিল। স্যাটেলাইট সংকেত, গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করেছে তারা। এর মাধ্যমে ইউক্রেন রুশ হামলা সম্পর্কে আগেভাগে আঁচ করতে পেরেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২৪ সময়ে ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলোর অস্ত্র আমদানির ৬৪ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ২০১৫-১৯ সময়ে এই হার ছিল ৫২ শতাংশ। গত বছর প্রকাশিত ন্যাটোর হিসাব অনুযায়ী, জোটের যৌথ বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ। জার্মানিও এ পরিমাণ চাঁদা দেয়। এই দুটি দেশ যৌথভাবে সর্বোচ্চ চাঁদা দেয়।

কোপেনহেগেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউরোপার প্রধান বিশ্লেষক ক্রিস্টিন নিসেন আল–জাজিরাকে বলেন, সামরিক দিক থেকে ইউরোপের সাম্প্রতিক প্রায় অর্ধেক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, বিশেষ করে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সফটওয়্যার–নির্ভর সিস্টেম ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো। তাঁর ভাষায়, সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে।

সম্পর্ক ভেঙে পড়লে কী হবে

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইউরোপ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তাতে সম্পর্ক ভেঙে পড়লে ইউরোপের হারানোর ঝুঁকি অনেক।

ইউরোপার প্রধান বিশ্লেষক ক্রিস্টিন নিসেন আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলে বা বড় ধরনের ঝামেলা হলে ইউরোপ সামরিক সহায়তা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আর্থিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। এই নির্ভরতার কারণেই ইউরোপ এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়নি বা সতর্ক থেকেছে।

নিসেনের মতে, স্বল্পমেয়াদে ইউরোপের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কার্যকরভাবে আলাদা হওয়া সম্ভব নয়। সেটা করতে গেলে বিপুল ক্ষতির শিকার হবে ইউরোপ। তিনি মনে করেন, হঠাৎ বিচ্ছেদের পথে না গিয়ে নতুন বাণিজ্য অংশীদার গড়ে তোলা এবং জরুরি পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে নির্ভরতা কমানোর কৌশল নেওয়া উচিত ইউরোপের।

ইউরোপ কৌশলগত সুরক্ষা হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে বৈচিত্র্যকরণের পথে এগোতে শুরু করেছে। একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমানো, অংশীদারি বিস্তৃত করা ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা জোরদার করার মাধ্যমে তারা এই পথে এগোচ্ছে।

একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, জ্বালানি অবকাঠামো ও শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাজনৈতিক মনোযোগ এসেছে। নিসেনের ভাষায়, লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং ধাপে ধাপে ঝুঁকি কমানো ও ইউরোপের কৌশলগত পরিসর বাড়ানো।