রেকর্ডসংখ্যক নরওয়েজিয়ান শীর্ষ ধনী দেশত্যাগ করেছেন। দেশটির ক্ষমতাসীন মধ্য-বাম দল সম্পদের কর বৃদ্ধি করে ১ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত করার পর অতি ধনীরা দেশত্যাগ করতে শুরু করেছেন। তাঁদের গন্তব্য যেসব দেশে করহার কম, সেসব দেশ। খবর দ্য গার্ডিয়ানের
নরওয়ের সংবাদপত্র দাগেনস নায়েরিংস্লিভের গবেষণা অনুসারে, ২০২২ সালে ৩০ জনের বেশি নরওয়েজীয় অতি ধনী দেশ ছেড়েছেন। এর আগে গত ১৩ বছরে যত ধনী মানুষ দেশ ছেড়েছেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ কেবল গত বছরেই দেশ ছেড়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের নভেম্বরে সম্পদের কর বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি ধনী দেশ ত্যাগ করবেন।
জানা গেছে, নরওয়ের এই দেশত্যাগী ধনীদের অনেকে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন। কারণ, সুইজারল্যান্ডে সম্পদের কর অনেক কম। এর মধ্যে আছেন নরওয়ের শীর্ষ ধনী টাইকুন কেজেল ইঙ্গে রোক্কে। যিনি তাঁর পছন্দের স্থান সুইজারল্যান্ডের লুগানোতে চলে গেছেন।
৬৪ বছর বয়সী রোক্কে নরওয়ের চতুর্থ ধনী, যাঁর সম্পদের মূল্য আনুমানিক ১৫০ কোটি ডলার। এক খোলা চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমি লুগানোকে নতুন বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছি। এমন নয় যে এখানে সবকিছু একেবারেই সস্তা বা সেখানে করহার সবচেয়ে কম। তবে এটি ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। আমার ও কোম্পানির যাঁরা ঘনিষ্ঠ তাঁদের বলছি, চাইলে এক ক্লিকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।’
রোক্কের দেশত্যাগের কারণে জন্য চলতি বছর দেড় কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব হারাবে নরওয়ে সরকার। গত বছর রোক্কে নরওয়ের সর্বোচ্চ করদাতা ব্যক্তি ছিলেন। সংবাদপত্র দাগেনস নায়েরিংস্লিভের হিসাব, ২০০৮ সাল থেকে তিনি প্রায় ১৪ কোটি ডলার কর দিয়েছেন।
বিষয়টি হলো নরওয়ের অতি ধনীদের ওপর সামান্য হারে কর বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এই অতি ধনীদের স্থানীয় ও রাজ্য উভয় পর্যায়ে সম্পদ করের সম্মুখীন তাঁরা দেশ ত্যাগ করছেন। দেশটিতে যাঁদের ১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সম্পত্তি আছে, যেসব দম্পতিদের ক্ষেত্রে ৩ লাখ ২০ ডলারের মূল্যের সম্পদের ওপর শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিক পর্যায়ে ১৮ লাখ ৯০ হাজার মূল্যের সম্পদ এবং দম্পত্তিদের ক্ষেত্রে ৩৭ লাখ মূল্যের সম্পদের ওপর ১ দশমিক ১ শতাংশ সম্পদের কর আরোপ করা হয়েছে। আর তাতেই দেশটির অতি ধনীদের এই আচমকা দেশত্যাগ।
নরওয়েজিয়ান বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ওলে জেসম অনস্টাড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, অতি ধনীদের দেশ ছাড়ার কারণে এ বছর দেশটির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
ওলে জেসম অনস্টাড আরও বলেন, ‘আমার মতে, এটি কিছুটা বেক্সিটের মতো। নরওয়ে নিজের ক্ষতি করতে চায় না এবং হঠাৎ উদ্যোক্তাদের বিদেশ গমনে নরওয়ের জন্য বড় ধাক্কা। কিছু রাজনীতিবিদ ধনী ব্যক্তিদের দেশত্যাগকে দোষারোপ করছেন। কিন্তু আমি মনে করি, অনেক সাধারণ মানুষ বিনিয়োগকারীদের দেশ ছেড়ে যাওয়া পছন্দ করছেন না।’
নরওয়ের এক স্যামন মাছচাষি ও বিনিয়োগকারী টর্ড উয়েল্যান্ড কোলস্টাড ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সম্পত্তিসহ উত্তর নরওয়ের বোডো থেকে সুইজারল্যান্ড চলে গেছেন। নরওয়ের এক টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি বলেন, ‘আমি দেশ ত্যাগ করতে চাইনি। কিন্তু বর্তমান সরকারের কঠোর ও বর্ধিত করের জন্য আমার মতো একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতা ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীর দেশ ত্যাগ করা ছাড়া বিকল্প নেই।’
কোলস্ট্যাড বলেছেন, করহার বৃদ্ধির কারণে তাঁকে প্রায় ৫৭ হাজার ডলারের মতো অতিরিক্ত কর দিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, এতে লভ্যাংশ হিসাবেও জটিলতা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, এটাই আজকের কর নীতির বাস্তবতা। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাইলে এ ধরনের খরচ চাপানো অযৌক্তিক।’
কোলস্ট্যাড নরওয়েজিয়ান সংবাদপত্র আফটেনপোস্টেনকে বলেন, ‘তিনি প্রথম যখন সুইজারল্যান্ডে আসেন, তখন সেখানে তাঁর কোনো বন্ধু ছিল না। কিন্তু এখন এখানে নরওয়ের অনেক মানুষই আছে, আমরা সবাই মাঝেমধ্যে একত্র হই।’
এদিকে নরওয়ের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এরলেন্ড গ্রিমস্টাড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তিনি আশা করেন, ধনী নরওয়েজিয়ানরা একটা সময় আবার দেশে ফিরবেন।
এরলেন্ড গ্রিমস্টাড বলেন, ‘যদি আপনি সাফল্য উপভোগ করেন এবং নরওয়েতে ধনী হন, আমরা আশা করি, আপনি নরওয়েতে থাকবেন এবং নরওয়ের সমাজের অংশ হয়েই থাকবেন। আমরা নরওয়েজিয়ানদের সফল ও ধনী হতে উৎসাহিত করি। আমরা বিশ্বাস করি, নরওয়ে মডেল একটি শক্তিশালী জনকল্যাণ ব্যবস্থা এবং মানুষের সফলতার জন্য উচ্চশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।’
নরওয়ে সম্পর্কে এরলেন্ড গ্রিমস্টাডের মত, ‘নরওয়ে মডেল হলো, সবাইকে যোগ্যতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অবদান রাখতে হবে এবং যাঁদের দেওয়ার ক্ষমতা বেশি, তাঁদের একটু বেশি দিতে হবে।’
বিশ্বের কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্রসহ উন্নত কয়েকটি দেশ, যারা ট্যাক্সহ্যাভেন বা কর ফাঁকির অভয়ারণ্য হিসেব পরিচিত। এর মধ্যে শীর্ষ ১০-এ আছে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, কেম্যান আইল্যান্ড, বারমুডা, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, হংকং, জার্সি, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক (টিজেএন) বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে কর ফাঁকি দিয়ে যে পরিমাণ অর্থ করস্বর্গখ্যাত দেশগুলোয় নিয়ে যাওয়া হয়, তার পরিমাণ ৪২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।