বিশ্ব অর্থনীতি

কৃষিনির্ভর ভিয়েতনাম যেভাবে ধনী দেশ হওয়ার পথে

যুদ্ধপীড়িত দেশটির অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ১৯৮৬ সালে সরকার অর্থনৈতিক নীতিতে সংস্কার করে, স্থানীয় ভাষায় যা ‘দইমই’ নামে পরিচিত। উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সে দেশের বাজার। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেওয়া হয় নানা ধরনের কর অবকাশসুবিধা। এতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হন।

ভিয়েতনামের একটি গাড়ির কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা
ছবি: সংগৃহীত

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকের কথা। চীনে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে গেলে দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেয় ভিয়েতনাম। এর ফলে চীন থেকে ট্রাকে করে কারখানার জন্য কাঁচামাল আনা বন্ধ হয়ে যায়। এতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে স্যামসাং কোম্পানির। দক্ষিণ কোরিয়ার এই হার্ডওয়্যার জায়ান্ট তাদের মুঠোফোন সেটের বড় অংশটি উৎপাদন করে ভিয়েতনামের কারখানা থেকে। আর তখন স্যামসাং তাদের দুটো স্মার্টফোন সেট কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ছেড়েছে। কোনোভাবেই উৎপাদন বিলম্বের সুযোগ নেই। এ অবস্থায় স্যামসাং চীনে উড়োজাহাজ পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে আসে।

ওই কঠিন সময়েও ভিয়েতনাম হেরে যায়নি। পরাজিত হয়নি সে দেশে বিনিয়োগ করা বড় বিদেশি কোম্পানিগুলোও।

ভিয়েতনাম বিশ্বের গুটিকয়েক দেশের অন্যতম, যারা শুরু থেকেই করোনা মোকাবিলায় সফল। তাদের ‘দ্রুত শনাক্ত ও বিচ্ছিন্নকরণ কৌশল’ শুরুতে অর্থনীতির ক্ষতি করলেও অন্যদের তুলনায় তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারে দেশটি। জ্বালানিসংকট পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ দেশের অর্থনীতি যখন সংকটে, প্রবৃদ্ধি যখন ঋণাত্মক, তখন ভিয়েতনামের অর্থনীতির যেন উল্টো চিত্র। আশপাশের দেশগুলোকে অবাক করে দিয়ে এ বছর বাড়তে যাচ্ছে তাদের জিডিপি। ২০০০ সালের পর থেকে গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ করে জিডিপি বাড়ছে দেশটির। ভিয়েতনাম প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) জন্য একটি পছন্দের দেশ। পোশাকশিল্পের জন্য দেশটির সুনাম বিশ্বব্যাপী। এখন সেমিকন্ডাক্টরসহ প্রযুক্তি খাতেও শক্তিশালী অবস্থান নিতে যাচ্ছে ভিয়েতনাম।

বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন ভিয়েতনাম ছিল বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি। যুদ্ধপীড়িত দেশটির অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ১৯৮৬ সালে সরকার অর্থনৈতিক নীতিতে সংস্কার করে, স্থানীয় ভাষায় যা ‘দইমই’ নামে পরিচিত। উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সে দেশের বাজার। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেওয়া হয় নানা ধরনের কর অবকাশ সুবিধা। এতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হন। আর ভিয়েতনামের সস্তা শ্রম এবং স্থিতিশীল বিনিময় হার তাদের সেখানে বিনিয়োগ করতে বিশেষভাবে উৎসাহ জোগায়।

সেই থেকে ভিয়েতনামের অর্থনীতি একটা টেকসই অবস্থানে রয়েছে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা ডংয়ের ততটা পতন ঘটতে দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বরং তাকে শক্তিশালীই রেখেছে ন্যায্যতার সঙ্গে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে শক্ত বিধি–বিধান। কম সুদে ঋণ নিয়ে নয়ছয়ের সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতিও সীমাবদ্ধ আছে এক অঙ্কে।

স্বপ্নের সিঁড়ি

গত শতকের ৯০–এর দশক ও ২০০০ সালের শুরুতে ভিয়েতনাম প্রায়ই চীনের সঙ্গে তুলনীয় হতো। এর কারণও ছিল। দুটোই কমিউনিস্ট–প্রধান দেশ, যারা পরবর্তী সময়ে উদারকরণের পথে হেঁটেছে। ভিয়েতনাম এখনো চীন হতে পারেনি, তবে সম্ভাবনার বাতি জ্বেলে রেখেছে।

ভিয়েতনাম ২০০৭ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়। এরপর দুই শিল্পোন্নত প্রতিবেশী জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একাধিক বাণিজ্য চুক্তি করে। এই দুই দেশ বর্তমানে ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করেছে ভিয়েতনাম। এসব পদক্ষেপ দেশটিতে এফডিআইয়ের চাকা ঘুরিয়ে চলেছে। এ বছর চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে বড় বিনিয়োগ পেয়েছে দেশটি। চীনে পণ্য উৎপাদনে খরচ বেশি, ভিয়েতনামে কম; প্রতিষ্ঠিত এই সত্যের কারণেই দলে দলে ভিয়েতনামে ঢুকছে বিদেশি কোম্পানিগুলো।

শুরুটা হয়েছিল পোশাকশিল্প দিয়ে। নাইকি, অ্যাডিডাসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলে–ফেঁপে উঠেছিল তুলনামূলক কম বেতনে শ্রমশক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে। এরপর ভিয়েতনাম হয়ে ওঠে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র। প্রচুর দক্ষ কর্মীর চাহিদা তৈরি হয় দেশটিতে। দেশি-বিদেশি তরুণ প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ভিয়েতনামের বড় বড় শহর। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২০ সালে দেশটির পণ্য রপ্তানির ৩৮ শতাংশই ছিল ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, দুই দশক আগে (২০০০ সালে) যা ছিল ১৪ শতাংশের কম।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয় ২০১৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর এই সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগায় প্রতিবেশী ভিয়েতনাম। পরের বছরই যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারের পণ্যের অর্ধেক এই ভিয়েতনামই সরবরাহ করে। বাণিজ্যযুদ্ধের আগে যা চীনই প্রায় এককভাবে সরবরাহ করত।

বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, করোনা মহামারির বিষয়ে চীনের নজিরবিহীন কড়াকড়ি এবং দেশটিতে পণ্য উৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধির কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে ভিয়েতনাম হয়ে পড়ে ‘অটোমেটিক চয়েস’। এখন অ্যাপলের বড় সরবরাহকারী ফক্সকন এবং পেগাট্রন, যারা অ্যাপল ওয়াচ, ম্যাকবুক এবং অন্যান্য গেজেট তৈরি করে, তারা ভিয়েতনামে বড় কারখানা তৈরি করছে। তারা হতে যাচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া চীন থেকে আরও যেসব বড় বড় কোম্পানি ভিয়েতনামমুখী হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ডেল, এইচপি (ল্যাপটপ), গুগল (ফোন) এবং মাইক্রোসফট (গেম কনসোলস)।

এসব কোম্পানি আগামী দিনগুলোয় আরও জোরেশোরে পণ্য উৎপাদন শুরু করবে। লাখো সাধারণ ভিয়েতনামির জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। এতে সে দেশে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির জনপ্রিয়তা শিখরে উঠবে, যে দল ১৯৭৫ সালের পর এককভাবে দেশটি শাসন করছে। ভিয়েতনাম ২০৪৫ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়ার মতো ধনী রাষ্ট্র হতে চায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির জনগণের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ৬৯৪ ডলার (২০২১ সালে), ২০৪৫ সাল নাগাদ যাতে ১৮ হাজার ডলার হতে পারে, সেই লক্ষ্যে কাজ করছে দেশটি।

এটা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়। তবে সস্তা শ্রমের পোশাক কারখানা থেকে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হতে গেলে দরকার প্রচুর বিনিয়োগ ও দক্ষ শ্রমশক্তি। এর অনেক কিছুই দেশটির পক্ষে আছে। ভিয়েতনামের শ্রমশক্তির বড় অংশটি এখনো তরুণ। অপর দিকে চীনের শ্রমশক্তি তুলনামূলক বয়সী। ভিয়েতনাম ডজনের বেশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উৎসাহী সদস্য, যার মাধ্যমে দেশটি পৌঁছে যেতে পারে হাজারো বিপণনব্যবস্থায়। আর এর রাজনৈতিক নেতারা কোভিড-১৯–এর ভয়ে ততটা ভীত নয়, যতটা চীন। মার্চ থেকেই পুরোপুরি সীমান্ত খুলে দিয়েছে ভিয়েতনাম, চীনে যেখানে এখনো বেজায় কড়াকড়ি।

ভিয়েতনামের ১০ কোটি মানুষের প্রতি ভৌগোলিক আশীর্বাদও রয়েছে। চীনের প্রযুক্তি রাজধানী শেনজেন থেকে মাত্র ১২ ঘণ্টার সড়ক দূরত্বে রয়েছে তারা। ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য এটা বড় সুবিধা। চাইলেই এক দৌড় দিয়ে শেনজেন থেকে মালামাল নিয়ে আসা যাচ্ছে, যেমনটা স্যামসাং করেছে। আর আসিয়ানের সদস্য ভিয়েতনামও একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় বড় সম্ভাবনা

ইলেকট্রনিকস সার্কিট, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ও চিপ ছাড়া এখন দুনিয়া অচল। স্মার্টফোন থেকে ইন্টারনেট, গাড়ি থেকে কাপড় ধোয়ার মেশিন—এগুলোর প্রাণভোমরা কোনো না কোনো মাইক্রোপ্রসেসর, আইসি বা ইন্টিগ্রেটেড বোর্ড। পৃথিবীতে একজন মানুষের বিপরীতে নাকি ৫০টি চিপস সক্রিয়। সেমিকন্ডাক্টর নামে পরিচিত এসব যন্ত্রের বৈশ্বিক বাজার গত বছর ছিল ৫২ হাজার কোটি ডলারের ওপরে। এসব ডিভাইসের ডিজাইন, প্রসেসিং ও প্যাকেজিংয়ের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ভিয়েতনাম এই ব্যবসায় বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সে দেশের এফটিপি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি মেডিকেল যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হয়, এমন সব সেমিকন্ডাক্টর বানাচ্ছে। ২০২৩ সালের মধ্যে আড়াই কোটি চিপস বানানোর লক্ষ্য তাদের, যা তারা রপ্তানি করবে জাপান, তাইওয়ান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে। এসব দেশ সেমিকন্ডাক্টরের বড় বাজার।

অপর দিকে স্যামসাং বলেছে, আগামী বছরের জুলাইতে ভিয়েতনামে তারা সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ তৈরি করবে। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় থাই নগুয়েন শহরে সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় ৯২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা। ইন্টেল গত বছরই ভিয়েতনামে তাদের চিপ তৈরির কারখানায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকনাভিওর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের চিপ উৎপাদন ১৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।

এখনো অনেক পথ

ভিয়েতনামের এখনো অনেক কিছু করার বাকি। সে দেশের স্থানীয় কোম্পানি আর বিদেশি কোম্পানির মধ্যে শক্তিসামর্থ্য ও উৎপাদনের জায়গা থেকে বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ কোম্পানিগুলোর রপ্তানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ আর বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির রপ্তানি বেড়েছে ৪২২ শতাংশ। দেশটিকে সামনে এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে যদি বিদেশি কোম্পানি ব্যবসা গোটানোর চিন্তা করে, তখন অর্থনীতিকে বেগ পেতে হবে। বিভিন্ন দেশে এ রকম উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে মিয়ানমার।

ভিয়েতনামে সস্তা শ্রমিক আছে, কিন্তু দক্ষ ব্যবস্থাপকের ঘাটতি আছে। স্যামসাং কোম্পানি স্বীকার করেছে, ভিয়েতনামে তারা অনেক ক্ষেত্রে তেমন কর্মী পায়নি, যাঁরা তাদের গুণমান অনুযায়ী কাজ করতে পারেন।

শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনের দিনগুলোয় ভিয়েতনামের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জেগে উঠতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তরুণদের শিক্ষাকাঠামো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকের এমন সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে যাতে পাস করার পরপরই তাঁরা কাজে বসতে পারেন।

ভিয়েতনামকে সুপরামর্শ দিয়েছেন নামকরা উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের ভিয়েতনাম প্রধান মাইকেল নগুয়েন। ইকোনমিস্টকে তিনি বলেছেন, ভিয়েতনামকে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ান হতে গেলে কেবল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করলে চলবে না, মানুষের ওপরও বিনিয়োগ করতে হবে। তবেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতৃত্ব দিতে পারবে দেশটি।