সোনার অলংকার
সোনার অলংকার

সোনার ভরি তিন লাখ ছুঁই ছুঁই

সোনার প্রতি যাঁদের আগ্রহ আছে, প্রতিদিনই তাঁরা এখন দুঃসংবাদ পাচ্ছেন। যেমন গত তিন দিনেই সোনার দাম ভরিতে বেড়েছে ২৮ হাজার ৮১০ টাকা। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বেড়েছে রেকর্ড ১৬ হাজার টাকা। এতে ভালো মানের, অর্থাৎ ২২ ক্যারেটে এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় বিশ্ববাজারেও সোনার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। দেশেও দাম সমন্বয় করছে জুয়েলার্স সমিতি। বিশ্ববাজারের দামে কিনতে হয়—এই অজুহাতে সব সময়ই দেশে সোনার দাম বেশি থাকে। বর্তমানে সেটি আরও বেড়েছে। শুধু তা–ই নয়, এক ভরির অলংকার বানাতে সোনার দামের সঙ্গে ভ্যাট ও মজুরি বাবদ বাড়তি দিতে হয় ১১ শতাংশ অর্থ। তাতে মোট খরচ দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বেশ কয়েকটি জুয়েলারি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় অনেক দিন ধরেই জুয়েলারি দোকানে বেচাবিক্রি কম। তবে কয়েক দিন ধরে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় বড় দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ সোনার অলংকার কিনছেন। দামের অস্থিরতা থাকায় অনেক দোকানদার অলংকার তৈরির ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন না; আগে থেকে প্রস্তুত অলংকার বিক্রি করছেন।

কয়েকজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী বলেন, সোনার দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা চলছে। দাম আরও বাড়লে অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন ব্যবসায়ীরা।

বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সোনার দামের উত্থান-পতনের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা মানে হচ্ছে সোনার মূল্যবৃদ্ধি। ইরানে বিক্ষোভ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনাসহ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে মাসখানেক আগে সোনার দাম নতুন করে বাড়তে থাকে। অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে দেখেন। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।

গত সোমবার ইতিহাসের প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বৈশ্বিক বাজার সোনার দাম পূর্বাভাসের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে সোনার দাম। বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস গত বছর বলেছিল, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে সোনার দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলারে উঠতে পারে। অথচ গতকাল প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৫৫৬ ডলার উঠেছিল। সম্প্রতি লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এ পূর্বাভাস সত্য হলে দেশে সোনার ভরি সাড়ে তিন লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। যতক্ষণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা না কমছে, ততক্ষণ সেই শঙ্কা থাকবেই।

দাম বেড়েছে ১,৬৮২ গুণ

দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সোনার ভরি ছিল ১৭০ টাকা। পরের সাড়ে পাঁচ দশকে সোনার দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৮২ গুণ। এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দর ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা।

জুয়েলার্স সমিতির তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে ২২ ক্যারেটের সোনার ভরি ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা। পরের পাঁচ বছরে সেটি দ্বিগুণ হয়। ২০১০ সালের সোনার দাম তিন গুণ বেড়ে হয় ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা। ২০১৫ সাল পর্যন্ত দাম খুব একটা না বাড়লেও পরের পাঁচ বছরে ভরিতে ২৬ হাজার ৮৫২ টাকা বাড়ে।

করোনার পর সোনার দাম দ্রুতগতিতে বাড়ে। ২০২৩ সালের ২১ জুলাই সোনার ভরি এক লাখ টাকায় পৌঁছায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ এবং অক্টোবরে দুই লাখ টাকায় মাইলফলক স্পর্শ করে। ২২ জানুয়ারি আড়াই লাখ টাকা পেরিয়ে যায় সোনার ভরি। চলতি মাসেই দাম বেড়েছে ৬১ হাজার ৮১৯ টাকা।

সোনায় বিনিয়োগ বাড়ছে

ঢাকার বায়তুল মোকাররম মার্কেটে ১২০টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় সোনার মূল্যবৃদ্ধির দুই ঘণ্টা পর মার্কেটে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটি বড় দোকানে দু–একজন ক্রেতা সোনার অলংকার দেখছেন। তবে তুলনামূলক ছোট-মাঝারি দোকানগুলো ছিল ক্রেতাশূন্য।

লিলি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী বাবলু দত্ত বলেন, টানা দাম বাড়তে থাকায় চার-পাঁচ দিন ধরে ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যে কেউ কেউ সোনার অলংকার কিনছেন। তবে দাম অনেক আগেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সামনের দিনে দাম না কমলে উচ্চবিত্ত ছাড়া আর কেউ সোনার অলংকার কিনতে পারবেন না।

ঢাকার বাইরের চিত্র

চট্টগ্রাম থেকে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, নগরের বিপণিবিতান, মিমি সুপারমার্কেট, দেওয়ান বাজার, হাজারি লেনসহ বিভিন্ন এলাকার জুয়েলারি দোকানে গতকাল বিকেলে ঘুরে ক্রেতা দেখা যায়নি। অধিকাংশ দোকানের কর্মী অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। তিন মাস ধরে এমন অবস্থা চললে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

সিইপিজেড এলাকায় প্রিয়তমা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী মিথুন ধর বলেন, বিত্তশালীরা আগে বিয়ের অলংকার তৈরি করাতেন পাঁচ ভরির। এখন দু-তিন ভরি দিয়ে সারছেন। অন্যদিকে নিম্নবিত্তদের অধিকাংশই নাকফুল দিয়ে সেরে ফেলছেন। সে কারণে ব্যবসা লোকসানে চলে গেছে।

প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধি জানান, নগরের জিন্দাবাজার এলাকার নেহার মার্কেট সোনা ব্যবসায়ীদের অন্যতম একটি বিপণিবিতান। ওই বিপণিবিতানে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে এক ঘণ্টা অবস্থান করে ক্রেতাদের দেখা মেলেনি। এ সময় দোকানের কর্মীদের অনেককে পরিচ্ছন্নতা কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

রনি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী রনি চক্রবর্তী বলেন, সকালে এসে দোকান খোলেন, আর রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন। প্রায়ই দিনই কোনো কেনাবেচা থাকে না। যার কারণে দোকানভাড়া ও কর্মীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

সিলেটের মহাজনপট্টির সোনার ব্যবসায়ী বিজয় কর্মকার বলেন, সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় গয়নার কারিগরেরা বেকায়দায় রয়েছেন। প্রায় এক মাস ধরে তাঁদের কাছে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ নেই বললেই চলে। সোনার পাশাপাশি রুপার দামও বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

দেশে দাম বেশি

বৈশ্বিক বাজারের চেয়ে সব সময়ই বাংলাদেশে সোনার দাম বেশি। দাম যত বাড়ছে, সেই ব্যবধানও বাড়ছে। বর্তমানে পাশের দেশ ভারতের তুলনায় ভরিতে সোনার দাম সাড়ে ১৯ হাজার টাকা বেশি।

ভারতের বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া দর বলছে, দেশটিতে গতকাল সোনার গয়নার দোকানে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের দর ছিল ২ লাখ ৪৯২ রুপি, যা দেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৬ টাকা। ভারত থেকে ১৯ হাজার ৫২৫ টাকা বেশি দামে সোনা কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশে।

দাম বেশি কেন—জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বসে বৈশ্বিক দামে সোনা কেনার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া সোনার অলংকার বানানোর মজুরি গ্রাহকেরা দিতে চান না। সে জন্য পাশের দেশের তুলনায় দাম কিছুটা বেশি হয়। তিনি বলেন, সোনার অলংকারে বর্তমানে ৫ শতাংশ ভ্যাট আছে। সেটি কমিয়ে ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ কিংবা মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।