জেন-জি বা জেনারেশন জেড নামে পরিচিত তরুণ প্রজন্মকে এআই–প্রযুক্তি সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিল গেটস
জেন-জি বা জেনারেশন জেড নামে পরিচিত তরুণ প্রজন্মকে এআই–প্রযুক্তি সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিল গেটস

মিলেনিয়ালের বই আর জেন–জির টেক: দুই প্রজন্মের মেলবন্ধনে যেভাবে বদলাচ্ছে চাকরির দুনিয়া

মরুভূমিতে পথ হারিয়েছেন এক মিলেনিয়াল ও এক জেন–জি তরুণ। মিলেনিয়াল ব্যক্তিটি পকেট থেকে বিশাল এক মানচিত্রের বই বের করে পাতা উল্টে পানির খোঁজ করছেন। আর জেন–জি তরুণটি স্মার্টফোনে সিগন্যাল খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘আরে ভাই, আগে একটু রিলস বানিয়ে নিই! নেটওয়ার্ক এলে অ্যাটলিস্ট মানুষ তো জানতে পারবে, আমরা কোথায় ফেঁসেছি!’

প্রজন্মের এই বৈচিত্র্য নিয়ে কৌতুকটি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। তবে বাস্তব ক্যারিয়ারের দুনিয়ায় এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে দারুণ এক রূপান্তরের গল্প। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশন’–এর একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ক্যারিয়ারের শুরুতে আয়ের দৌড়ে মিলেনিয়ালদের (যাঁদের জন্ম আশির শুরু থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি) চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে জেন–জি তরুণেরা (যাঁদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২–এর মধ্যে)। বৈশ্বিক মন্দার কারণে মিলেনিয়ালরা শুরুতে যে ধাক্কা খেয়েছিলেন, জেন–জিরা তা চটজলদি কাটিয়ে উঠছেন। ২৪ বছর বয়সে এসে আগের প্রজন্মের চেয়ে তাঁদের প্রকৃত আয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। সর্বনিম্ন আয়ের ক্ষেত্রে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৬ শতাংশ!

তবে এই চমৎকার আর্থিক সুসংবাদের পাশাপাশি এক অদৃশ্য ইতিবাচক প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে কর্মক্ষেত্রে, যা বাংলাদেশের পটভূমিতেও দারুণ প্রাসঙ্গিক।

ঢাকার একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের টিম লিডার ৩৫ বছর বয়সী তানজিলা। তাঁর ডেস্কজুড়ে সাজানো বই ও ডায়েরি। যেকোনো নতুন প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার আগে তানজিলার প্রধান অভ্যাস হলো বিস্তর পড়াশোনা করা। তানজিলা বলছিলেন, ‘আমাদের সময়ে ইন্টারনেটের চেয়ে বইয়ের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল। তাই যেকোনো বিষয়ের গভীরে যাওয়ার একটা ধৈর্য আমাদের তৈরি হয়েছে। আমি চাই, আমাদের টিমের জেন–জি সহকর্মীরাও এই পড়ার অভ্যাস ধরুক। শুধু ওপর ওপর স্ক্রল না করে গবেষণার ডেপথটা বুঝুক।’

তানজিলার টিমেরই ২৬ বছর বয়সী জেন–জি ডেভেলপার আদিব। নতুন যেকোনো এআই টুল বা প্রযুক্তির আপডেট আদিবের নখদর্পণে। আদিব চটজলদি ল্যাপটপ স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আপুর কাছ থেকে আমি শিখেছি, কীভাবে একটা জটিল বিষয়ের পেছনে ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হয়। বই পড়ার যে একটা আলাদা শক্তি আছে, সেটা ওনার দেখাদেখি আমিও এখন রপ্ত করার চেষ্টা করছি।’

তানজিলা ও আদিবের কাছ থেকে টিমমেটরা শিখছেন নতুন সব টেক ট্রিকস। আদিবের চটপটে প্রযুক্তির চর্চা তানজিলার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতাকে দিচ্ছে এক আধুনিক গতি। তানজিলা এখন এআই টুল ব্যবহার করে তাঁর প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন মুহূর্তেই নিখুঁতভাবে তৈরি করে ফেলছেন।

এই অফিসে আরও একজন আছেন—জীবন রায়। তিনি মিলেনিয়াল ও জেন–জির একদম মাঝামাঝি এক প্রজন্মের প্রতিনিধি। জীবন বলেন, ‘আমাদের অফিসে এখন কোনো জেনারেশন গ্যাপ নেই। তানজিলা আপুর গভীর জ্ঞান ও আদিবের টেকনিক্যাল স্মার্টনেস—এই দুইয়ের ইতিবাচক আদান–প্রদানে আমাদের পুরো টিমের কাজের কোয়ালিটি এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে।’

গবেষণা অবশ্য সতর্ক করছে, বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে জেন–জিদের ক্যারিয়ারের এই সুসময় যেকোনো সময় হুমকির মুখে পড়তে পারে। আর ঠিক এই জায়গাতেই মিলেনিয়ালদের ‘ধৈর্য ও পড়ার অভ্যাস’ এবং জেন–জিদের ‘প্রযুক্তি চর্চা’ এক হওয়া জরুরি।

এটিই আসলে বর্তমান চাকরির জগতের সবচেয়ে চমৎকার ও সুখকর দৃশ্য। এক প্রজন্মের কাছে আছে বইয়ের পাতা থেকে আসা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা, আর অন্য প্রজন্মের কাছে আছে প্রযুক্তির আধুনিকতম ছোঁয়া। দুই প্রজন্ম যদি নিজেদের অহংকার ভুলে কর্মক্ষেত্রে এভাবে একে অপরের সেরা গুণগুলো লুফে নেয়, তবে কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, দিন শেষে উপকৃত হবে পুরো দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র। জ্ঞান ও প্রযুক্তির এই চমৎকার যুগলবন্দীই তৈরি করছে আগামী দিনের সবচেয়ে স্মার্ট চাকরির দুনিয়া।