বাংলাদেশে বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা হলো সরকারি প্রথম শ্রেণির ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। দীর্ঘ তিন ধাপের (প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক) পরীক্ষা পেরিয়ে যে স্বল্পসংখ্যক প্রার্থী ক্যাডার পদে সুপারিশ পান, তাঁদের বাইরে হাজারো যোগ্য প্রার্থী চাকরিছাড়া থেকে যান। এসব লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু ক্যাডার পদ না পাওয়া প্রার্থীদের সরকারি বিভিন্ন নন–ক্যাডার (প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির) পদে নিয়োগের সুযোগ দিতে ২০১০ সালে বিশেষ নন–ক্যাডার বিধিমালা চালু করা হয়। এই বিধির আওতায় নবম থেকে দ্বাদশ গ্রেডের শূন্যপদগুলোতে বিসিএসে উত্তীর্ণ অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। কারণ, এতে বারবার আলাদা পরীক্ষা না দিয়ে একটি বিসিএসের ফল দিয়েই ক্যাডার না পাওয়া অনেক মেধাবী প্রার্থী সরকারি চাকরির সুযোগ পেতে থাকেন।
২০১৪ সালে সিদ্ধান্ত হয় যে শুধু প্রথম শ্রেণি নয়, দ্বিতীয় শ্রেণির শূন্যপদেও বিসিএস উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর পর থেকে প্রতি বিসিএসেই ক্যাডার ছাড়াও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উত্তীর্ণ প্রার্থী নন–ক্যাডার পদে নিয়োগ পেয়ে আসছেন। উদাহরণস্বরূপ, ৩৪তম থেকে ৪১তম বিসিএস পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার থেকে ৪ হাজারের বেশি প্রার্থী নন–ক্যাডার পদে নিয়োগ পেয়েছেন (prothomalo.com)। যেমন, ৪০তম বিসিএসে প্রায় ৪ হাজার ৩২২ জন এবং ৪১তম বিসিএসে ৩ হাজার ১৬৪ জন উত্তীর্ণ প্রার্থী বিভিন্ন নন–ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন। এত বিপুলসংখ্যক মেধাবীর সরকারি সেবা করার সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত করতে পেরে এই ব্যবস্থা প্রশংসিত ছিল।
তবে ২০২৩ সালে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ‘নন–ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা–২০২৩’ জারি করার পর থেকে এই প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
৪০ থেকে ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার নিয়োগ—
৪০তম থেকে ৪৫তম বিসিএসে বিভিন্ন রাউন্ডে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) নন-ক্যাডার পদে নিম্নরূপ প্রার্থীদের সুপারিশ করেছে—
৪০তম বিসিএস: পিএসসি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে ৯ম থেকে ১২ম গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে ৩ হাজার ৬৫৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
৪১তম বিসিএস: চূড়ান্ত ফলাফলে নন-ক্যাডার পদে ৩ হাজার ১৬৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
৪২তম বিসিএস: এ বিশেষ ব্যাচটি শুধুমাত্র চিকিৎসকদের জন্য ছিল। এখানে পিএসসি ৩ হাজার ৯৫৭ জন চিকিৎসকের নিয়োগ সুপারিশ করেছিল, পরবর্তী সময়ে নন-ক্যাডার পদে ৫৩৯ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।
৪৩তম বিসিএস: ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৮০৫ জন সুপারিশপ্রাপ্ত, নন-ক্যাডারের ৬৪২ জন।
৪৪তম বিসিএস: পিএসসি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে মোট ৩ হাজার ৯৭৭ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৪৫তম বিসিএস: সংশোধিত ৫৬৫টি শূন্যপদের বিপরীতে ৫৪৫ জনকে নন-ক্যাডার পদে সাময়িক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
৪৬তম বিসিএসের পরিসংখ্যান ও বৈষম্যের ইঙ্গিত
৪৬তম বিসিএসে লিখিত উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে মোট ৩ হাজার ১৪০ জনকে বিভিন্ন ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে (prothomalo.com)। ফলে প্রায় ৯০০ জন (৪০৪২–৩১৪০) লিখিত উত্তীর্ণ প্রার্থী সরাসরি ক্যাডার পদ থেকে বাদ পড়বেন, যা স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার অংশ। কিন্তু এখানে পদের ধরনের বৈষম্যের কারণে সাধারণ ক্যাডার বিভাগের প্রার্থীদের ওপর ভারসম্যের অভাবটি চোখে পড়ছে।
৪৬তম বিসিএসের মোট ক্যাডার পদের মধ্যে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৭০০টির বেশি পদ শুধু চিকিৎসক/স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য নির্ধারিত। বিপরীতে সাধারণ ক্যাডারের (প্রশাসন, পুলিশ, কর ইত্যাদি মিলিয়ে) পদ মাত্র ৪৮৯টি। কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাধারণ ক্যাডার বিভাগের প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৩৬ জন (এ ছাড়া সাধারণ এবং কারিগরি/পেশাগত উভয় ক্যাডারে ৯৬৮ জনের বেশির ভাগও সাধারণ ক্যাডারের যোগ্যতায় প্রতিযোগিতা করবেন)। অর্থাৎ সাধারণ ক্যাডারের জন্য যোগ্য প্রার্থী সংখ্যা তিন হাজারের বেশি, অথচ পদ আছে মাত্র ৪৮৯টি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য/কারিগরি ক্যাডারে মোট প্রার্থীর তুলনায় পদ অনেক বেশি; বিশেষ করে স্বাস্থ্য ক্যাডারে ১ হাজার ৬৯৮ পদ রয়েছে, যেখানে চিকিৎসক ও অন্যান্য কারিগরি মিলে মোট উত্তীর্ণ প্রার্থীসংখ্যা সে তুলনায় কম। ফলস্বরূপ, সাধারণ ক্যাডার শ্রেণির যোগ্য প্রার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যাডার পদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ভাইভা শেষে সাধারণ ক্যাডার ও উভয় ক্যাডার মিলে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ জন মেধাবী প্রার্থীকে কোনো ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ দেওয়া সম্ভব হবে না, কারণ তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত পদ নেই। এতজন উচ্চ মেধাসম্পন্ন ও পরিশ্রমী প্রার্থীর ‘শূন্য হাতে’ ফিরে যাওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। পিএসসির মূল্যায়নে তারা প্রিলিমিনারি ও লিখিত উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও যোগ্য প্রার্থী বলে স্বীকৃত, তবু শুধু সীমিত ক্যাডার পদের কারণে কোনো চাকরি না পাওয়ার পরিস্থিতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি প্রার্থীদের জন্য যেমন মানসিকভাবে হতাশাজনক, তেমনি বৃহত্তর পরিসরে এটি একটি সাংগঠনিক বৈষম্যের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। এত বছর পরিশ্রমের পর এই তরুণ মেধাবীদের সরকারি চাকরির সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা যুক্তিসংগত হবে না।
নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা, ২০২৩-এর আলোকে ৪৬তম বিসিএসে নন-ক্যাডার নিয়োগের আইনগত ও বাস্তব সুযোগ:
১. বিধিমালা ২০২৩-এর মূল উদ্দেশ্য
নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা, ২০২৩ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল—
বিসিএস পরীক্ষায় মেধাক্রমে উত্তীর্ণ অথচ ক্যাডার পদ না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা
দীর্ঘ ও জটিল নিয়োগপ্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করা
রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরের বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ শূন্যপদ পূরণ করা
এই বিধিমালার কোথাও এমন কোনো বিধান নেই যে কোনো বিসিএসে নন-ক্যাডার দেওয়া যাবে না, যদি তা বিজ্ঞপ্তিতে আগে উল্লেখ না থাকে।
২. বিধি ৪(১)
এখানে বিসিএস বিজ্ঞপ্তিতে নন-ক্যাডার পদের বিবরণ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এই ধারায় কোথাও বলা নেই যে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ না থাকলে পরে নন-ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
অর্থাৎ এটি নির্দেশনামূলক ধারা, কোনো নিষেধাজ্ঞামূলক ধারা নয়।
৩. বিধি ৬(১)
এটাই পুরো বিধিমালার মূল চালিকা ধারা।
এই ধারা অনুযায়ী নন-ক্যাডার নিয়োগের একমাত্র ট্রিগার হলো সরকারের নিকট থেকে শূন্য পদের অধিযাচন প্রাপ্তি।
এখানে সার্কুলারের সময় পদ ছিল কি না—এমন কোনো শর্ত নেই।
অধিযাচন পেলেই পিএসসি আইনগতভাবে সুপারিশ দিতে সক্ষম।
৪. বিধি ৮
যদি বাস্তব প্রয়োগে কোনো অস্পষ্টতা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়,
এই ধারাই তার সরাসরি সমাধান দিয়েছে—
সরকার গেজেট আদেশ জারি করে অসুবিধা দূর করতে পারে।
অর্থাৎ বিধিমালার মধ্যেই সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা লেখা আছে।
৫. ৪৬তম বিসিএসের বাস্তব প্রেক্ষাপট: কেন নন-ক্যাডার দেওয়া আরও যৌক্তিক
৪৬তম বিসিএসের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব ও ব্যতিক্রমী দিক রয়েছে—
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৪২ জন
মোট শূন্যপদের সংখ্যা ৩ হাজার ২০০+, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০+ চিকিৎসক (পেশাগত) পদ সাধারণ ক্যাডার পদ মাত্র ৪৮৯টি
অথচ সাধারণ ক্যাডারে লিখিত উত্তীর্ণ ২ হাজার ৩৩৬ জন
সাধারণ ও কারিগরি/পেশাগত উভয় ক্যাডারে লিখিত উত্তীর্ণ ৯৬৮ জন
ফলে—
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেধাবী, যোগ্য ও ভাইভা-পাস প্রার্থী
ক্যাডার বা নন-ক্যাডার কোনো পদই না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরবে
এটি বিধিমালার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
করণীয়: নন-ক্যাডার নিয়োগ বৃদ্ধি করে বৈষম্য হ্রাস
ওপরে বর্ণিত পরিস্থিতিতে, পিএসসি ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষের উচিত ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে ৪৬তম বিসিএসের সাধারণ ক্যাডারে উত্তীর্ণ বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর জন্য যথাযথ নন-ক্যাডার পদ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। বর্তমান নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালা ২০২৩–এর আলোকে এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত ও সম্ভবপর পদক্ষেপ। ইতিমধ্যে পূর্ববর্তী বিসিএস পরীক্ষাগুলোতেও এই বিধিমালা অনুসরণ করে মেধাবীদের সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে (যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে)। ৪৬তম বিসিএসের ক্ষেত্রেও একইভাবে দ্রুত নন-ক্যাডার নিয়োগ শুরু করলে—
ক্যাডার পদ না পাওয়া ২ হাজারের কাছাকাছি প্রার্থী সরকারি প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে নিযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন, ফলে তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে।
পিএসসির দ্রুত ফল প্রকাশের লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নেবে, কারণ ক্যাডারসহ নন-ক্যাডার মিলিয়ে প্রায় সব উত্তীর্ণ প্রার্থী অল্পসময়ে তাদের চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন। কেউ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ তালিকায় থেকেই হতাশ হবেন না।
পিএসসির গ্রহণযোগ্যতা ও সুনাম বৃদ্ধি পাবে, কেননা মেধাবীদের উপযুক্ত স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আন্তরিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে। এতে ভবিষ্যতে মেধাবী তরুণেরা বিসিএসে অংশ নিতে আরও উৎসাহিত হবেন।
পরিশেষে, ৪৬তম বিসিএসে পিএসসি যে স্বচ্ছ ও দ্রুতগতির নিয়োগপ্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে হয়। একই সঙ্গে, বিপুলসংখ্যক সাধারণ ক্যাডার উত্তীর্ণ মেধাবীদের জন্য বিধি মোতাবেক নন-ক্যাডার নিয়োগের সুপারিশ করা এখন সময়ের দাবি। এতে একদিকে সব যোগ্য প্রার্থী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন খালি পদগুলোও দক্ষ জনবল দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে। এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ৪৬তম বিসিএস সত্যিকার অর্থে একটি সফল ও বৈষম্যহীন নিয়োগপর্ব হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা প্রার্থীদের আত্মত্যাগ ও মেধার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান জানাবে।
সর্বোপরি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ রইল যে ৪৬তম বিসিএসের উত্তীর্ণ কিন্তু ক্যাডার-পদবঞ্চিত প্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত নন-ক্যাডার পদ দ্রুত ঘোষণা ও বরাদ্দ করুন। এতে করে মেধাবী তরুণ প্রজন্ম হতাশ না হয়ে বরং দেশ গড়ার কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং পিএসসির প্রয়াস সার্থক হবে।
*তথ্যসূত্র: সরকারি কর্ম কমিশনের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্য
*লেখক: ৪৬তম বিসিএসে চাকরিপ্রত্যাশী। (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)