প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য নতুন কাজ কতটা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের মধ্যেই সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতার নতুন চিত্র সামনে এসেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রার্থী। অর্থাৎ একটি পদের জন্য গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন। চাকরির বাজারে নতুন মানুষের চাপ বাড়লেও তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
সমাজসেবা অধিদপ্তর ৫২টি ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৮৫ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। ২ জুন থেকে ২৩ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদনপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার প্রার্থী আবেদন জমা দিয়েছেন। মোট পদসংখ্যা দিয়ে হিসাব করলে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন। এটি কোনো বিসিএস পরীক্ষা নয়, কিংবা পদগুলোর শিক্ষাগত যোগ্যতাও এক নয়। বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যন্ত বিভিন্ন যোগ্যতার প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ ছিল। সবচেয়ে বেশি ৪৭৮টি পদ ছিল অফিস সহায়কের, যার জন্য এসএসসি পাস হলেই আবেদন করা গেছে। এ ছাড়া ৩১২টি ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদসহ শিক্ষক, কম্পিউটার অপারেটর, কারিগরি প্রশিক্ষক ও ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগের সুযোগ ছিল।
এত বিপুলসংখ্যক আবেদন এখন নিয়োগদাতা সংস্থার জন্যও বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২১ লাখের বেশি প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কেন্দ্র, প্রশ্নপত্র, পরীক্ষক ও খাতা মূল্যায়নের সার্বিক আয়োজন করা একটি বিশাল কাজ। এখনো পরীক্ষার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়নি। পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থী আবেদন করেছেন। পরীক্ষা আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আবেদনসংখ্যা সাম্প্রতিক বিসিএসগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ৫০তম বিসিএসে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার, ৪৯তম বিসিএসে ৩ লাখ ১২ হাজারের বেশি এবং ৪৭তম বিসিএসে ৩ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। অর্থাৎ বিসিএসের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি আবেদন এসেছে এই একটি অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের সংখ্যাও কম নয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে শূন্য পদের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি, যা পূরণে সরকার নতুন করে তথ্য সংগ্রহ ও নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে প্রতিবছর কত মানুষ নতুন করে আসেন, এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হিসাব এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও সংস্থাটি এ তথ্য উল্লেখ করেছে।
অবশ্য এই ২০ লাখের সবাই সরাসরি চাকরির প্রার্থী নন; কেউ ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে যান, কেউ প্রবাসে পাড়ি জমান, আবার কেউ পড়ালেখা বা অন্যান্য কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হন না। তবে কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানো তরুণের সংখ্যা এবং নতুন চাকরি তৈরির ব্যবধানটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছালেও একই সময়ে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ নতুন কর্মপ্রার্থীর তুলনায় চাকরি সৃষ্টির গতি ছিল বেশ ধীর। উপরন্তু, ওই সময়ে তৈরি হওয়া নতুন কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ গেছে নিম্ন-উৎপাদনশীল কৃষি খাতে, যেখানে উল্টো উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের বিপুল চাহিদার নেপথ্যে কেবল চাকরির স্থায়িত্ব বা নিরাপত্তার বিষয়টি কাজ করছে না, বরং বেসরকারি খাতে নতুন নিয়োগের গতি কমে যাওয়াও এর একটি বড় কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রভাবে বেসরকারি নিয়োগ কমে যাওয়ায় সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়া মাত্রই আবেদনের জোয়ার তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত ফাইন্যান্স ও ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি নিয়োগে ২১ লাখের বেশি আবেদন পড়া মূলত সেই গভীর অর্থনৈতিক চাপেরই সাম্প্রতিক বহিঃপ্রকাশ। ২০ লাখ তরুণের শ্রমবাজারে আগমন ও নতুন কাজ তৈরির এই বড় ব্যবধান শেষ পর্যন্ত একই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে—চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে?