রাজশাহীর পুঠিয়ার এক প্রান্তিক গ্রাম নলপুকুরিয়া। গ্রামের কাদামাখা মেঠো পথ মাড়িয়েই বড় হয়েছেন শামীম শাহরিয়ার। বাবা হাতেম আলী একজন সাধারণ কৃষক। অন্যদিকে ফরিদপুরের নগরকান্দার নারায়ণ মল্লিক একজন জেলে। মাঘের কনকনে শীতে কোমরসমান পানিতে জাল ফেলে যিনি বড় করেছেন চিকিৎসক ছেলে উজ্জ্বল মল্লিককে। শামীম ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে দেশে প্রথম হয়েছেন। উজ্জ্বল সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে। তাঁদের হাত ধরেই সুদিনের স্বপ্ন দেখছিল পরিবার দুটি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পুলিশি ভেরিফিকেশনের ‘অদৃশ্য’ জালে আটকে গেছে। ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে নাম ওঠেনি এই দুই মেধাবীর। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁদের ঈর্ষণীয় সাফল্য আজ ম্লান স্রেফ একটি ‘নেতিবাচক’ পুলিশি প্রতিবেদনে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এই ভেরিফিকেশন–বৈষম্যের পুরোনো প্রথা ভাঙতে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তবে সম্প্রতি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় বঞ্চিতদের আশা, তাঁরা ন্যায়বিচার পাবেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই শক্তিশালী ম্যান্ডেটের সরকারই পারবে ‘রাজনৈতিক’ ভেরিফিকেশনের মতো একটা বর্বর প্রথাকে বিলোপ করতে।
৪৪তম বিসিএসে এক নজিরবিহীন স্বপ্নভঙ্গের গল্প তৈরি হয়েছে শামীম শাহরিয়ারকে ঘিরে। ৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েও বাবার স্বপ্নপূরণে তিনি যোগ দেননি। বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে কূটনীতিক হবে। শামীম ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ফলও পেয়েছিলেন হাতেনাতে—৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। কিন্তু ৪৪তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশের দিন দেখা গেল তাতে শামীমের নাম নেই। কৃষক বাবা হাতেম আলী এখন বোবাকান্নায় দিন পার করছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির ধারেকাছেও কোনো দিন যাইনি। সকাল-সন্ধ্যা জমিতে ফসল ফলিয়েছি। আমার ছেলের প্রতি এই অবিচার কেন? আমি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
‘বিষয়টি আমি আপনাদের কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের বিষয়ে আমি দ্রুত খোঁজ নেব। অন্যায়ভাবে কোনো মেধাবী যাতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগবঞ্চিত না হন, সেটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।’আবদুল বারী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী
একই বিসিএস থেকে বাদ পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী রাব্বি লেলিন আহমেদ। প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত লেলিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরীক্ষায় দ্বিতীয় এবং ফার্মেসি কাউন্সিলে প্রথম হয়েছিলেন। নিজের মেধার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। বিসিএসের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। অথচ কোনো রাজনৈতিক পদপদবি বা মামলা না থাকা সত্ত্বেও নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনে তাঁর নিয়োগ আটকে গেছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতায় ৪৪তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন—এমন ১১ জন চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে প্রথম আলো যোগাযোগ করতে পেরেছে। তবে ভুক্তভোগীর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিয়োগবঞ্চিতদের তালিকায় আরও রয়েছেন মসিউর রহমান (লাইভস্টক), শরিফুল আলম সুমন (লাইভস্টক), শফিউল ইসলাম সজন (সাধারণ শিক্ষা), শান্তনু দাশ (প্রশাসন), সাদমান ফাহিম (স্বাস্থ্য), সোহানা আরেফিন (সাধারণ শিক্ষা), রোহান ইসলাম (মৎস্য), সম্রাট আকবর (কৃষি), খালেদ সাইফুল্লাহ ইলিয়াস (কারিগরি শিক্ষা) ও সোয়ান ইসলাম সজীব (প্রশাসন)।
৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) চিত্রটি আরও করুণ। এখানে ২১ জন চিকিৎসক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেট বঞ্চিত হয়েছেন। বিস্ময়করভাবে এর মধ্যে ১৫ জনই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁদেরই একজন সিরাজাম মুনিরা। রাজনীতির ছায়া মাড়াবেন না বলে ছাত্রজীবনে কোনো সভা-সেমিনারেও যাননি তিনি। অথচ আজ সেই সতর্কতাই যেন বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিয়োগবঞ্চিত উজ্জ্বল মল্লিকের বাবা জেলে নারায়ণ মল্লিকের প্রশ্ন তুলেছেন, ‘একজন জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল যে মেধায় টিকেও তার ছেলে চাকরি পাবে না?’ একই বিসিএস থেকে বাদ পড়েছেন পাভেল ইসলাম, যাঁর বাবা পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের ফসলি জমির প্রায় সবই বিক্রি করেছেন।
৪৮তম বিসিএসে গেজেট–বঞ্চিত ২১ চিকিৎসক হলেন ডা. উজ্জ্বল মল্লিক, ডা. মো. পাভেল ইসলাম, ডা. সিরাজাম মুনিরা, ডা. শুভ্র দেবনাথ নীলু, ডা. ইলহামুর রেজা চৌধুরী, ডা. মুশফিকুর রহমান ভূঁইয়া, ডা. আলভি ফারাজী, ডা. মো. রাইসুল করিম নিশান, ডা. মেহেদী হাসান, ডা. মো. সাব্বির আহম্মেদ তুষার, ডা. মো. সুমন আহম্মেদ, ডা. সৌরভ সরকার দীপ্র, ডা. অনিন্দ্য কুশল পাল, ডা. অনুপম ভট্টাচার্য্য, ডা. নাহিদুর রহমান, ডা. ইমতিয়াজ উদ্দিন মানিক, ডা. আহমেদ মুনতাকিম চৌধুরী, ডা. সাদি বিন শামস, ডা. নাজমুল হক, ডা. এ এইচ এম সাখারব ও ডা. সাবিহা আফরিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীর পারিবারিক বা আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক সমাজের পরিপন্থী। সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা থাকলেও ভেরিফিকেশনের এই প্রক্রিয়া সেই অধিকারকে লঙ্ঘন করছে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর–আল–মতিন বলেন, ‘প্রার্থীর নিজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না থাকলে কেবল রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। নতুন সরকারের উচিত এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পুরোপুরি উপড়ে ফেলা।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মানসুর হোসেন জানিয়েছেন, বঞ্চিত প্রার্থীরা সচিবের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন এবং পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
তবে সবচেয়ে বড় আশার কথা শুনিয়েছেন নতুন সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি আপনাদের কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের বিষয়ে আমি দ্রুত খোঁজ নেব। অন্যায়ভাবে কোনো মেধাবী যাতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগবঞ্চিত না হন, সেটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আর পুরো পুলিশ ভেরিফিকেশন–ব্যবস্থাটা ঢেলে সাজানো হবে, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর কখনো সৃষ্টি না হয়।’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভেরিফিকেশন জরুরি, তবে তা যেন মেধাবী ও নিরীহ নাগরিকদের ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণ না হয়। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সিভিল সার্ভিস গঠনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার প্রথম পরীক্ষা হতে পারে এই ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএসের গেজেটবঞ্চিতদের সংকট নিরসন। মেধার জয় নিশ্চিত করতে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে, হাতেম আলী কিংবা নারায়ণ মল্লিকের মতো বাবাদের ত্যাগ ও চোখের জলের মূল্য রাষ্ট্র কতটুকু দেবে।