এআইয়ে যেভাবে বদলে যাচ্ছে চীনের চাকরিবাজার

চীনের শ্রমবাজার একটি বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের দ্রুত প্রবৃদ্ধির পর দেশটি যখন নতুন প্রবৃদ্ধি মডেলের দিকে এগোচ্ছে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর খাতগুলো কর্মসংস্থানের নতুন চালিকা শক্তি হয়ে উঠছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই রূপান্তরের ফলে ডিজিটাল দক্ষতা আর বিকল্প নয়, বরং বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে।

নিচে চীনের শ্রমবাজারে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো—

উদীয়মান শিল্প: নতুন কর্মসংস্থানের ভান্ডার

নতুন জ্বালানি, নতুন উপকরণ, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং ‘লো-অলটিটিউড ইকোনমি’ (ড্রোন ও স্বল্প উচ্চতার উড্ডয়নভিত্তিক শিল্প) আগামী পাঁচ বছরে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরি করবে। শুধু ড্রোনশিল্পেই প্রায় ১০ লাখ পাইলটের চাহিদা তৈরি হতে পারে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ‘এমবডিড এআই’—সবই বড় শিল্পে রূপ নেওয়ার পথে।

এআই: কাজ কেড়ে নিচ্ছে না, রূপ বদলাচ্ছে

ডার্ক ফ্যাক্টরি বা স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমছে, তবে একই সঙ্গে বাড়ছে উচ্চমূল্যের এআই-সম্পর্কিত পেশা। গত পাঁচ বছরে ঘোষিত ৭২টি নতুন পেশার মধ্যে ২০টির বেশি এআইনির্ভর, প্রতিটি পেশায় তিন থেকে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। এআই প্রোডাক্ট ম্যানেজারের চাহিদা এক বছরে প্রায় ১৭৮ শতাংশ বেড়েছে।

সেবা খাত এখনো সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী

স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক পরিচর্যা, শিশুযত্ন ও গৃহস্থালি সেবায় চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের ৪৮ শতাংশ সেবা খাতে হলেও পাঁচ বছরে তা ৫৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সাধারণ শ্রমের জায়গায় এখন বিশেষায়িত ও পেশাদার সেবার চাহিদা বাড়ছে।

বাড়ছে সুরক্ষার উদ্যোগ

গিগ ইকোনমি, লাইভ স্ট্রিমিংসহ নমনীয় কাজে যুক্ত আছেন দুই কোটির বেশি মানুষ। নতুন পরিকল্পনায় প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য আঘাতজনিত বিমা ও আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বহুভাষিক দক্ষতা

চীনের উচ্চমাত্রার উন্মুক্তকরণ নীতির ফলে সীমান্ত পাড়ি বাণিজ্য বাড়ছে। স্প্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ কর্মী, ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস্ট ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজারের চাহিদা তীব্র। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স লজিস্টিকস খাতে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ চাকরি তৈরি হবে।

গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও নতুন কৃষক

গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির আওতায় পর্যটন, বিশেষ কৃষিপণ্য ও ওয়েলনেস ব্যবসায় নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ প্রত্যাবর্তনকারী উদ্যোক্তা গ্রামাঞ্চলকে নতুন উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছেন।

সৃজনশীল শিল্প

ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), এআইভিত্তিক কনটেন্ট ও ডিজিটাল সংস্কৃতি চীনের সাংস্কৃতিক শিল্পকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে পরিণত করেছে। ২০২৪ সালে এই খাতের আয় ১৯.১৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮ লাখ ভিআর পেশাজীবীর প্রয়োজন হবে বলে ধারণা।

বড় ঘাটতির খাত

৪ কোটি ৪০ লাখ প্রবীণ সহায়তা প্রয়োজন হলেও ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ পরিচর্যা কর্মীর। ফলে এই খাত স্থিতিশীল ও নীতিগতভাবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

সবুজ চাকরি

নিম্ন-কার্বন অর্থনীতিতে চীন ইতিমধ্যে ১৩৪টি সবুজ পেশা স্বীকৃতি দিয়েছে। জ্বালানি সংরক্ষণ, হাইড্রোজেন, সৌর উৎপাদন ও পরিবেশগত ডেটা বিশ্লেষণে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ছে।

আঞ্চলিক কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র

বেইজিং-শাংহাইকেন্দ্রিক প্রবণতা কমে ইয়াংজি ডেল্টা, চেংদু-চংকিং ও অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি শহরগুলো নতুন কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে চীনের শ্রমবাজারে বড় রদবদল অনিবার্য। যারা নতুন দক্ষতা অর্জনে এগোবে, তাদের জন্য আগামী পাঁচ বছর হতে পারে অভূতপূর্ব সুযোগের সময়।