৫০তম বিসিএস: স্বল্প সময়ে লিখিত পরীক্ষা প্রস্তুতি যে কৌশলে

আগামী ৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ৫০তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা। প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়ার উপায় ও বিগত বিসিএস লিখিত পরীক্ষার আলোকে পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল জানাচ্ছেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শক রবিউল আলম লুইপা।

৫০তম বিসিএস লিখিত প্রার্থীরা প্রস্তুতির জন্য অল্প সময় পেতে যাচ্ছেন। প্রিলি পরীক্ষায় সবার প্রশ্নোত্তর একই হলেও লিখিত পরীক্ষার উত্তরদানের ভিন্নমাত্রা ও লেখার মানের ওপর প্রাপ্ত নম্বর নির্ভর করবে। তাই স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে সিলেবাস ও বিগত প্রশ্ন থেকে ধারণা নিতে হবে, সারা জীবনের অর্জিত জ্ঞানগুলো কীভাবে অ্যাপ্লাই করা যায় সেগুলো সাজিয়ে নিতে হবে এবং নিয়মিত মডেল টেস্ট দিয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতে হবে।

স্বল্প সময়ে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি—

১.

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাইড ও রেফারেন্স বই থেকে পুরো সিলেবাস একবার কমপ্লিট করুন। পুরো সিলেবাসকে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে ভাগ করলে প্রতিদিন কতটুকু পড়তে হবে, সেটি বুঝতে পারবেন। সময় কম পেলে রিডিং পড়ুন, সময় বেশি পেলে আত্মস্থ করুন ও অ্যানালাইসিস করে করে পড়ুন। গণিত ও অনুবাদ প্রতিদিন অল্প অল্প করে চর্চা করুন।

.

বাংলা ব্যাকরণ–সম্পর্কিত প্রশ্ন-৩০ নম্বর, বাংলা ভাষা–সম্পর্কিত প্রশ্ন-৩০ নম্বর, অনুবাদ-১৫ নম্বর, ইংরেজি কমপ্রিহেনশন-৩০ নম্বর, লেটার টু এডিটর-২০ নম্বর, ইংরেজি অনুবাদ-৫০ নম্বর, গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা-১০০ নম্বর, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-১০০ নম্বর, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি কনসেপচ্যুয়াল ইস্যু-৪০ নম্বর এই ৪১৫ নম্বরে ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলে ফুলমার্ক পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে ইংরেজি ভার্সনে উত্তরদান আপনাকে অন্যদের চেয়ে নম্বরের দিক দিয়ে এগিয়ে রাখবে নিশ্চিতভাবে।

বিসিএস পরীক্ষা শেষ করে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

৩.

গৎবাঁধা প্রস্তুতি না নিয়ে প্রস্তুতিতে কৌশলী হোন। যেমন—বাংলা গ্রন্থ সমালোচনা ও ইংরেজি লেটার টু এডিটরের ক্ষেত্রে একটা কমন ফরম্যাট তৈরি করুন। যেটিই আসুক না কেন, ফরম্যাট একই থাকবে, শুধু কনটেন্ট ভিন্ন ভিন্ন হবে। আবার বাংলা ও ইংরেজি রচনার ক্ষেত্রে বিগত প্রশ্ন অ্যানালাইসিস করে ১০ থেকে ১২টি রচনা সিলেক্ট করুন ও এর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, কবিতার পঙ্‌ক্তি ও প্রয়োজনীয় অলংকরণ প্রস্তুত করে রাখুন। কোন ধরনের রচনায় কত পৃষ্ঠা লিখবেন, কী কী পয়েন্ট থাকবে, এগুলোও প্রস্তুতির সময় ঠিক করে রাখুন।

৪.

লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে আপনার জ্ঞানের চেয়ে সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাই যত বই বা সূত্র থেকে যত বিশেষভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে পারবেন, প্রতিযোগিতায় আপনি ততই এগিয়ে থাকবেন। তথ্য, টেবিল বা গ্রাফের সঙ্গে অবশ্যই তথ্যসূত্র (বইয়ের নাম ও লেখক বা পত্রিকার নাম ও তারিখ) লিখবেন। উত্তরপত্রে আপনার লেখা হতে হবে তথ্যবহুল। যেমন—একটি বিষয়ের গুরুত্ব আলোচনা করার সময় স্কুল-কলেজ লেভেলের মতো গতানুগতিকভাবে না লিখে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক গুরুত্বগুলো গবেষণাধর্মী তথ্য, উপাত্ত ও উদ্ধৃতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রেজেন্টেশনের জন্য কালো কালির পাশাপাশি কোটেশন লিখতে নীল কালি ব্যবহার করতে পারেন স্কেলিং, গ্রাফ, চার্ট অবশ্যই পেনসিল দিয়ে করবেন। হাতের লেখা সুন্দর হলে ভালো, না হলেও উত্তরপত্র অবশ্যই পরিপাটি রাখার চেষ্টা করবেন।

বাংলা ব্যাকরণ–সম্পর্কিত প্রশ্নে ৩০, বাংলা ভাষা–সম্পর্কিত প্রশ্নে ৩০, অনুবাদে ১৫, ইংরেজি কমপ্রিহেনশনে ৩০, লেটার টু এডিটর ২০, ইংরেজি অনুবাদে ৫০, গণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতায় ১০০, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১০০, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি কনসেপচ্যুয়াল ইস্যু-৪০ নম্বরসহ মোট ৪১৫ নম্বরে ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলে ফুলমার্ক পাওয়া সম্ভব।

৫.

প্রত্যাশিত ক্যাডার পেতে হলে লিখিত পরীক্ষায় ৯০০ নম্বরের মধ্যে ৬০০+ নম্বরের টার্গেট থাকতে হবে। আপনি সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের হলে আপনার স্ট্রেংথ উইকনেস এক রকম হবে, নন-সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড হলে আপনার স্ট্রেংথ উইকনেস আরেক রকম হবে। দুর্বলতা আছে এমন বিষয়গুলো ডিফেন্সিভ মুড এবং ভালো পারেন এমন বিষয়গুলোতে বেশি নম্বর নিশ্চিত করুন। তবে সব সাবজেক্ট মিলিয়ে গড়পড়তা আপনাকে ৬০০ নম্বর তুলতেই হবে, এটি মাথায় রাখুন।

৬.

লিখিত পরীক্ষায় ‘সময় বণ্টন’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় প্রতি নম্বরের জন্য ১ মিনিট ১২ সেকেন্ড ও ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় প্রতি নম্বরের জন্য ১ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড করে সময় পাবেন। এভাবে প্রতিটি প্রশ্নের নম্বরের দিকে লক্ষ রেখে সময় বরাদ্দ করবেন। প্রশ্নোত্তরের পরিসর ও গুরুত্ব অনুযায়ী সময় বণ্টন নিজের মতো পরিবর্তন বা সাজিয়ে নেবেন। তবে পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উত্তর লেখা শেষ করবেন।

চলছে বিসিএসের প্রস্তুতি

৭.

সবচেয়ে আসল পরামর্শ হলো—নিয়মিত যতটুকু পড়বেন, ততটুকু লিখুন। সপ্তাহান্তে সপ্তাহের পড়াগুলোর থেকে নিজে নিজে মডেল টেস্ট দিয়ে ঝালিয়ে নিন। বাসায় বসে কিংবা কোনো কোচিংয়ে নিয়মিত মডেল টেস্ট দিয়ে হাতের লেখার গতি বাড়ান। আপনি কতটুকু পড়লেন বা জানলেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনি কতটুকু লিখতে পারলেন। লিখিত পরীক্ষায় মোট ২৪ ঘণ্টা লিখতে হয়। বুঝতেই পারছেন, ফাস্ট হ্যান্ডরাইটিং এবং শারীরিক সক্ষমতা কতটা দরকার!

৪৭তম, ৪৬তম ও ৪৫তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—

ক.

বোথ ক্যাডার প্রার্থীদের ২০০ নম্বর ও ১০০ নম্বরের দুটো বাংলা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় এবং জেনারেল/প্রফেশনাল ক্যাডার প্রার্থীদের শুধু ১০০ নম্বরের বাংলা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সম্প্রতি সাহিত্য অংশে ১০টি প্রশ্নের স্থলে ৫টি প্রশ্ন করা হচ্ছে। এখানে ২/১টা আনকমন প্রশ্ন আসতে পারে, সেটি আগে থেকেই মাথায় রাখুন। রচনার ক্ষেত্রে এখন আর বিকল্প/অপশন থাকে না।

খ.

ইংরেজি কমপ্রিহেনশনগুলোর লেভেল কঠিনতর হচ্ছে, তাই বিদেশি ওয়েবসাইট থেকে প্রস্তুতি নেওয়া একটি ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। অল্প সময়ে কমপ্রিহেনশন উত্তরের জন্য আগে প্রশ্নগুলোতে চোখ বুলিয়ে তারপর মূল কমপ্রিহেনশন পড়ুন।

গ.

স্বল্প সময়ে নন-সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের গণিত প্রস্তুতি নিতে প্রচুর বেগ পেতে হয়, সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের এখানে অল্প সময় দিলেই হয়ে যাবে। নন-সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের বিগত প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে নিয়মিত আসে এমন অধ্যায়গুলো (যেমন সেট, বিন্যাস, সমাবেশ, ত্রিকোণমিতি ইত্যাদি) ভালো করে পড়ে কঠিন গণিতের কিছু নম্বর স্কিপ করে গণিত বিষয়টিকে ডিফেন্সিভ মোডে মোকাবিলা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মানসিক দক্ষতা প্রিলিমিনারি প্রস্তুতির সঙ্গে ২/১ দিন রিভিশন দিলেই লিখিত প্রস্তুতি হয়ে যাবে।

ঘ.

গণিতের মতো সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অংশটিও সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য সহজভাবে এবং নন-সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের জন্য ডিফেন্সিভ মোডে মোকাবিলা করতে হবে। সাধারণ বিজ্ঞান ও ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিকস অংশে কিছু কঠিন প্রশ্ন আসতে পারে, সে ক্ষেত্রে একদম না পারলে কিছু নম্বর স্কিপ হতে পারে, বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর অল্প প্রস্তুতিতেই কমন পেয়ে যাবেন।

ঙ.

বাংলাদেশ বিষয়াবলি বিষয়ে পূর্বের বিসিএসে ৫ নম্বরের ৪০টি প্রশ্ন এলেও সর্বশেষ ৪৫তম, ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসে ২০ নম্বরের ১০টি প্রশ্ন এসেছে। ১০টি প্রশ্ন করা হলে ডেটা, চার্ট, গ্রাফ, ম্যাপ, কোটেশন প্রভৃতি তথ্য–উপাত্ত দেওয়ার জন্য মোটামুটি সময় পাবেন। ৪০টি প্রশ্ন করা হলে ফুল আনসার করার ক্ষেত্রেই জোর দিতে হবে। তবে যে ফরম্যাটেই প্রশ্ন করা হোক অল্প লেখায় অধিক তথ্য ও বিশ্লেষণ আপনার উত্তরকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করবে। স্বল্প সময়ে এত বড় সিলেবাসের প্রস্তুতি ও অধিক প্রশ্ন কমনের জন্য যে অধ্যায়গুলো থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে (যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি) সেই অধ্যায়গুলো জোর দিয়ে পড়ুন।

চ.

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে অ্যানালাইটিক্যাল ইস্যু অংশ তুলনামূলক সহজ। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব (যেমন ইরান-ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র-চীন, মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট প্রভৃতি) টপিকগুলোর বিস্তারিত ধারণা নিন। প্রবলেম সলভিং ইস্যু অংশে কতটুকু ভালো করতে পারবেন তা নির্ভর করবে আপনার বৈশ্বিক জ্ঞান ও নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ার ওপর। কনসেপচ্যুয়াল ইস্যু অংশে ২/১টা কঠিন ও আনকমন প্রশ্ন এলে সেটি ধারণা থেকে লেখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।

বিসিএস লিখিত প্রস্তুতিমূলক পরামর্শ অল্প লেখায় তুলে ধরা কঠিন। পুরো লেখার সারমর্ম হলো—সিলেবাস এবং বিগত প্রশ্ন অ্যানালাইসিস করে পড়ুন, রুটিন করে সিলেবাস শেষ করুন এবং নিয়মিত/সপ্তাহান্তে সময় বণ্টন করে মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফ্রিহ্যান্ড লেখার অভ্যাস করুন। আপনার লিখিত পরীক্ষা প্রত্যাশিত হবে আশা করছি।