১৯তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার আবেদন শেষ হয়েছে। সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে এবার ২৫০ জন নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হবে এই দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া। ১০০ নম্বরের এই পরীক্ষায় থাকবে ১০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন। পাস নম্বর ৫০। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে ০.২৫ নম্বর। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই যাঁরা ১৯তম বিজেএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের হাতে থাকা সময়টি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা জরুরি। বিজেএসের প্রিলিমিনারিতে শুধু অনেক পড়লেই হবে না। কী পড়বেন, কোন বিষয় কতটা পড়বেন এবং পড়া বিষয়টি কীভাবে মনে রাখবেন—এসবও প্রস্তুতির অংশ।
সিলেবাস আগে, বই পরে—
প্রস্তুতির শুরুতেই সর্বশেষ সিলেবাসটি সামনে রাখা উচিত। অনেক পরীক্ষার্থী একসঙ্গে একাধিক গাইড, নোট, কোচিংয়ের হ্যান্ডনোট ও বিভিন্ন অনলাইন উপকরণ সংগ্রহ করেন। এতে পড়ার পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু অনেক সময় প্রস্তুতিকে ছাড়িয়ে যায়।
একটি নির্দিষ্ট মূল বই বা উৎস ঠিক করে তার সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নোট ও প্রশ্নব্যাংক ব্যবহার করা ভালো। কোন বিষয় এখনো পড়া হয়নি, কোনটি একবার পড়া হয়েছে এবং কোনটি ভালোভাবে আয়ত্ত হয়েছে—এভাবে নিজের প্রস্তুতির একটি তালিকা করা যেতে পারে।
প্রস্তুতির শুরুতে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, প্রিলিমিনারি পার হওয়াই শেষ লক্ষ্য নয়। বিজেএসের লিখিত পরীক্ষা ১০০০ নম্বরের। তাই প্রিলিমিনারির জন্য পড়তে গিয়ে শুধু এমসিকিউর উত্তর মুখস্থ না করে বিষয়গুলো বুঝে পড়ার অভ্যাস করা উচিত।
আইন পড়ুন মূল আইন সামনে রেখে—
বিজেএসের প্রস্তুতিতে আইন অংশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন, সংবিধান, তামাদি আইন, নির্দিষ্ট প্রতিকার আইনসহ সিলেবাসে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো ভালোভাবে পড়তে হবে।
তবে আইন পড়ার সময় শুধু গাইড বা নোটের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়, বার অ্যাক্ট বা মূল আইন সামনে রেখে পড়ার অভ্যাস করতে হবে।
কোনো ধারা পড়ার সময় শুধু ধারার নম্বর মুখস্থ করলে হবে না। জানতে হবে—ধারাটিতে কী বলা হয়েছে, কখন তা প্রযোজ্য, এর ব্যতিক্রম কী, সংশ্লিষ্ট অন্য ধারা কোনটি এবং বাস্তবে এর প্রয়োগ কোথায়।
কারণ, এমসিকিউতে প্রশ্ন সব সময় সরাসরি আসে না। একটি ঘটনা বা পরিস্থিতি বর্ণনা করে জানতে চাওয়া হতে পারে, সেখানে কোন বিধান প্রযোজ্য। তাই ধারার ভাষা ও প্রয়োগ—দুটিই বুঝতে হবে।
বিশেষ করে অপরাধসংক্রান্ত আইন পড়ার সময় অপরাধের সংজ্ঞা, উপাদান, শাস্তি, আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা এবং বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। একইভাবে দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে এখতিয়ার, তামাদি, ডিক্রি, আপিল, রিভিশন, প্রতিকার ও সংশ্লিষ্ট সময়সীমা ভালোভাবে পড়তে হবে।
বিশেষ আইন পড়ার সহজ কৌশল—
বিশেষ আইনগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিটি আইন একই গভীরতায় পড়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে।
যেসব ধারায় অপরাধ, শাস্তি, আদালত, এখতিয়ার, আমলযোগ্যতা, জামিন, সময়সীমা বা নির্দিষ্ট দিনের কথা বলা আছে, সেগুলো আলাদা করে নোট করা ভালো।
একই ধরনের দুটি আইনের বিধানের মধ্যে পার্থক্যও খেয়াল করতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষায় কাছাকাছি দুটি বিধান দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাই শুধু ‘কোন আইনে কী আছে’ জানলেই হবে না; ‘কোন আইনে কী নেই’ সেটিও জানা দরকার।
সংবিধান শুধু অনুচ্ছেদ মুখস্থ নয়—
সংবিধানের প্রস্তুতিতে অনেকেই অনুচ্ছেদের নম্বর মুখস্থ করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। অনুচ্ছেদের নম্বর জানা প্রয়োজন; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট বিধানটি বোঝা।
সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস, রাষ্ট্রের মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।
বিভিন্ন সংশোধনী সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। কোন সংশোধনীর মাধ্যমে কী পরিবর্তন হয়েছে—এ ধরনের তথ্য এমসিকিউর জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ রায় পড়ুন—
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায়গুলোও প্রস্তুতির অংশ হওয়া উচিত। সব রায়ের বিস্তারিত পড়ার প্রয়োজন নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় কী প্রশ্ন উঠেছিল, আদালত কী নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেই নীতির গুরুত্ব কী—এগুলো সংক্ষেপে জানা দরকার।
এখানে একটি ছোট নোট তৈরি করা যেতে পারে। মামলার নাম, মূল আইনগত প্রশ্ন এবং আদালতের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় লিখে রাখলে পরে দ্রুত রিভিশন দেওয়া সম্ভব।
বাংলা ও ইংরেজিকে শেষের জন্য রাখবেন না—
আইন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তের জন্য রেখে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিদিন অল্প সময় করে এই দুই বিষয়ে চর্চা করা যেতে পারে।
বাংলায় ব্যাকরণের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, সমাস, কারক, সন্ধি, বানান, সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ, বাগধারা ইত্যাদি নিয়মিত অনুশীলন করা দরকার। সাহিত্য অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিক, তাঁদের প্রধান রচনা, ছদ্মনাম, উপাধি ও উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
ইংরেজির ক্ষেত্রে Vocabulary, Preposition, Correction, Idioms and Phrases, Subject-Verb Agreement এবং গুরুত্বপূর্ণ grammatical rules চর্চা করতে হবে। প্রতিদিন নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি আগের শব্দগুলোও আবার দেখা জরুরি।
সাধারণ জ্ঞান, গণিত ও বুদ্ধিমত্তায় নিয়মিত চর্চা
বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য শুধু সাম্প্রতিক ঘটনা পড়লেই হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের ইতিহাস সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা দরকার।
গণিতের ক্ষেত্রে পাটিগণিতের মৌলিক হিসাব, শতকরা, অনুপাত, লাভ-ক্ষতি, গড়, সুদ, সময়-দূরত্ব ও প্রয়োজনীয় বীজগণিতের সূত্র অনুশীলন করা যেতে পারে।
বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নের জন্য নিয়মিত মডেল প্রশ্ন সমাধান করা দরকার। প্রথম দিকে যে প্রশ্নে বেশি সময় লাগে, নিয়মিত অনুশীলনে সেটিই পরে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়।
সবশেষে প্রস্তুতির সময় মনে রাখতে হবে—বিজেএস প্রিলিমিনারি শুধু বেশি পড়ার পরীক্ষা নয়। এটি সঠিক বিষয় বেছে নিয়ে পড়া, পড়া বিষয় বারবার মনে করা এবং প্রয়োজনের সময় তা প্রয়োগ করার পরীক্ষা। তাই এখন থেকে যতটা সম্ভব পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।