অস্ট্রেলিয়া ভিসা নিয়ে প্রতারকের ফাঁদে পা দেওয়ার আগে যাচাই করুন সঠিক প্রক্রিয়া

বাংলাদেশি নাগরিকদের অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস ও কাজের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ভুয়া কিছু মাইগ্রেশন এজেন্ট ও প্রতারক চক্র। সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইট বানিয়ে ভুয়া স্পন্সরশিপ ও কাজের ভিজিট ভিসা দেওয়ার অভিযোগে একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়া বা কাজের ভিসা পাওয়ার লোভ দেখিয়ে তৈরি করা এসব ফাঁদ সম্পর্কে সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন জানিয়েছে, ভুয়া মাইগ্রেশন এজেন্টদের প্রতারণা থেকে বাঁচতে ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শের জন্য নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট অথবা আইনজীবীর শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ায় আসতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের এই প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সঠিক অভিবাসনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতেই এই প্রতিবেদন।

শুরুতে যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—

১.

অস্ট্রেলিয়ায় যেকোনো স্থায়ী কাজ বা স্কিলড ভিসায় আসার প্রধান শর্ত হলো নির্দিষ্ট পেশায় উচ্চ দক্ষতার সনদ এবং ভাষাগত যোগ্যতা (আইইএলটিএস বা সমমানের আন্তর্জাতিক ইংরেজি পরীক্ষায় ভালো স্কোর)। কোনো ভাষা পরীক্ষা বা দক্ষতা মূল্যায়ন ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় সরকারিভাবে সরাসরি কাজের ভিসা পাওয়ার সুযোগ নেই।

২.

অনেকেই মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো অস্ট্রেলিয়ায় কফিল বা সাধারণ ভিসা কেনাবেচা করা যায়। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা দেওয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব সরকারের অভিবাসন বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স)। কোনো ব্যক্তি, নিয়োগকর্তা বা সংস্থা ভিসার গ্যারান্টি দিতে পারে না। এমন কি কোন আইনজীবীও কখনো নিশ্চয়তা দেয় না।

৩.

অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ভিসা নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া বেশ কঠোর। স্থানীয় বাজারে উপযুক্ত দক্ষ জনবল না পাওয়া গেলেই কেবল একজন অস্ট্রেলীয় নিয়োগকর্তা বিদেশ থেকে কর্মী স্পন্সর করার আবেদন করতে পারেন, যা বেশ ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

একজন নিবন্ধিত অভিবাসন আইনজীবী কীভাবে চেনা যাবে?

অস্ট্রেলিয়া সরকারের আইন অনুযায়ী, ভিসার পরামর্শ বা সেবা দেওয়ার জন্য একজন এজেন্টকে অবশ্যই ‘অফিস অব মাইগ্রেশন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অথরিটি’ বা ‘ওমারা’ (OMARA)-র নিবন্ধিত হতে হয়।

একজন নিবন্ধিত এজেন্টদের সরকারের নির্দিষ্ট কিছু আইনি নিয়ম ও আচরণবিধি মেনে চলতে হয়:

—তারা কাজের ধরন অনুযায়ী কেবল ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ফি গ্রহণ করবেন।

—সেবা শুরু করার আগেই খরচ এবং সেবার পরিধি সম্পর্কে গ্রাহককে লিখিত চুক্তিপত্র বা লিখিত তথ্য দেবেন।

—আবেদনের ফলাফল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীকে অবহিত করবেন।

—অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওমারা (OMARA) পোর্টালে (www.mara.gov.au) গিয়ে অনলাইন তালিকায় যেকোনো নিবন্ধিত এজেন্টের নাম বা নম্বর সহজেই বিনা মূল্যে যাচাই করে নেওয়া যায়।

প্রতারক চক্র যেভাবে সাধারণত প্রতারণা করে—

সিডনি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অভিজ্ঞ মহলের সঙ্গে কথা বলে প্রতারকদের সাধারণ কিছু কৌশল চিহ্নিত করা গেছে:

নকল ওয়েবসাইট: অস্ট্রেলিয়া সরকারের ভিসা পোর্টালে ডট জিওভি ডট এইউ (.gov.au) যুক্ত থাকে। প্রতারকেরা প্রায় একই নাম দিয়ে তৈরি ডট কম (.com) বা ডট নেট (.net) ডোমেইনের মাধ্যমে ভুয়া ভিসা যাচাইয়ের সুবিধা দেখায়।

ভুল আশ্বাস: ‘শতাধিক পদের জন্য কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া নিয়োগ’, ‘কাজের ভিসা থেকে দুই মাসে নিশ্চিত স্থায়ী নাগরিকত্ব’, ‘কোনো ইন্টারভিউ বা ইংরেজি দক্ষতা লাগবে না’—এ ধরনের কথা বললেই বুঝে নেবেন এটি প্রতারণা।

কাজের ভুয়া চুক্তিপত্র (অফার লেটার): অস্ট্রেলিয়ার নামী কোনো প্রতিষ্ঠানের প্যাড ও লোগো ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জাল কাজের নিয়োগপত্র তৈরি করে অগ্রিম টাকা দাবি করা হয়।

অনলাইন নম্বর থেকে কল: ওভারসিস বা ইন্টারনেট ফোন নম্বর ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়া থেকে কল এসেছে বলে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়।

প্রতারণা

কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন—

১. ভিসার কোনো টাকা লেনদেনের আগে এজেন্টের নিবন্ধন নম্বর পরীক্ষা করুন।

২. ব্যক্তিগত ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। সব লেনদেনের লিখিত রসিদ সংগ্রহ করুন।

৩. অস্ট্রেলিয়ার ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো কাজের জন্য শুধু সরকারের অফিশিয়াল অভিবাসনসংক্রান্ত ওয়েবসাইট (immi.homeaffairs.gov.au) অনুসরণ করুন।

৪. কোনো নিয়োগকর্তার কাছ থেকে কাজের অফার পেলে সরাসরি সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে যোগাযোগের তথ্য নিয়ে সত্যতা যাচাই করুন।

অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীদের মতামত—

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এ বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তানভীর আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন অস্ট্রেলিয়ায় লাখ লাখ টাকা দিলেই ভিসা মিলবে। কিন্তু বাস্তবে আইন অত্যন্ত কঠোর। দক্ষতা ও ভাষার প্রমাণ ছাড়া এখানে কাজের ভিসা পাওয়া অসম্ভব। ভুয়া এজেন্টের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে সারা জীবনের সঞ্চয় নষ্ট করবেন না।’

শারমিন সুলতানার ভাষ্য, ‘প্রতারকেরা আজকাল হুবহু সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া লিঙ্ক পাঠায়। অনেকেই না বুঝে সেই ফাঁদে পা দেন। টাকা দেওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওমারা পোর্টালে গিয়ে এজেন্টের নিবন্ধন সত্যই আছে কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ, এটুকু সচেতনতা সবাইকে দেখাতে হবে।’

কায়সার চৌধুরী বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থায় ‘শর্টকাট’ বলে কিছু নেই। প্রকৃত নিয়ম মেনে যোগ্যতা থাকলে তবেই আবেদন করুন। না জেনে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীকে টাকা দেওয়া মানে নিজের ক্ষতি ডেকে আনা।’

অস্ট্রেলিয়ায় সুন্দর ও সফল ভবিষ্যতের স্বপ্ন সবারই থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারকের চক্রান্তে পড়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়। সঠিক তথ্য, বৈধ পথ ও সচেতনতাই নিরাপদ অভিবাসনের একমাত্র চাবিকাঠি।

* কাউসার খান, প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী

ই–মেইল: kawsar.khan.au@gmail.com