উচ্চ আদালতের রায়ে দীর্ঘদিনের আইনি বাধা কেটেছে। এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির মূল প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। তবে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় যেন কোনো যোগ্য শিক্ষক অন্যায্যভাবে বঞ্চিত না হন, সে জন্য জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা ‘গ্রেডেশন’ প্রস্তুত ও নিখুঁত করার কাজে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক যুগ ধরে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষকদের চাকরিবহি সংশোধন, পদোন্নতির যোগ্যতা নির্ধারণ এবং জ্যেষ্ঠতার ক্রম ঠিক করার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই পূর্বের সব ভুলত্রুটি এড়িয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও নির্ভুল তালিকা তৈরি করাই এখন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান অগ্রাধিকার।
পদোন্নতির সার্বিক অগ্রগতি ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সুনির্দিষ্ট দাবি প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানান, দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির কাজটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এই গ্রেডেশন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন না হলে অনেক জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষক তাঁদের প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিক্ষকেরা একটি দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন, তাঁদের এই আবেগের বিষয়টি আমরা গভীরভাবে অনুধাবন করি। তাই পদোন্নতি প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়, সেই চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
গত ২ জুন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতিসংক্রান্ত সব আইনি জটিলতা নিরসন হয়। ওই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সারা দেশের মোট ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য পদে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত করার আইনি ও প্রশাসনিক পথ উন্মুক্ত হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সারা দেশের মাঠপর্যায়ে কর্মরত সহকারী শিক্ষকেরা। তবে তাঁদের এখন প্রধান দাবি, জ্যেষ্ঠতার তালিকা অতি দ্রুত চূড়ান্ত করে পদোন্নতির চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা। একই পদে ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত থাকার কারণে শিক্ষকদের পেশাগত জীবনে যে চরম স্থবিরতা ও হতাশা তৈরি হয়েছিল, দ্রুত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই কেবল তার অবসান সম্ভব।
শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও একাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। হাজার হাজার বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব সামলালেও পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক পদায়ন করা হলে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক গুণগত মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
তবে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা একটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ৩৬ হাজার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রেণিকক্ষে বড় ধরনের সহকারী শিক্ষক–সংকট তৈরি হবে। পূর্বের শূন্য পদ এবং এই পদোন্নতির ফলে খালি হওয়া পদ মিলিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে যাবে। এই তৈরি হতে যাওয়া তীব্র শিক্ষক–সংকট সামাল দিতে হলে পদোন্নতির পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিশাল পরিসরে নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।