হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোদ্দারপাড়া, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ। ৫ এপ্রিল ২০২৬
হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোদ্দারপাড়া, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ। ৫ এপ্রিল ২০২৬

হামের সংক্রমণ ও জনবলসংকট

টিকাদানে কর্মীর অভাব, স্বাস্থ্যে ১ লাখ কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে সরকার

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের টিকা দিচ্ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী আবুল হায়েক। তাঁর উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর ৪৭টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১৫ জন। নিজের কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে আবুল হায়েক বলেন, ‘জনবলসংকট থাকায় আমাদের কাজের চাপ কিছুটা বেশি। নিয়মিত দায়িত্বের বাইরেও বাড়তি কাজ করতে হয়। তবে টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে অন্য বিভাগের কর্মীরাও আমাদের সহযোগিতা করছেন। সবাই মিলে চেষ্টা করছি, যাতে কোনো শিশু টিকার বাইরে না থাকে।’ হায়েকের মতো হাজারো মাঠকর্মী এখন বাড়তি দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেশের তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা সচল রেখেছেন।

হামের প্রকোপ ও মৃত্যুঝুঁকি

মাঠপর্যায়ের এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ জন শিশুর মৃত্যু হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত কয়েক বছর মাঠপর্যায়ে সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত টিকার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশে স্বাস্থ্য সহকারীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনবলসংকট রয়েছে, এটি আমরা জানি। এই শূন্যতা পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগে ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

খুলনা ও রংপুর বিভাগের জনবল চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে স্বাস্থ্য খাতের জনবলসংকট বেশ প্রকট। এখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১ হাজার ৪১১টি পদের বিপরীতে ৪৪ শতাংশ বা ৬২০টি পদই খালি। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৪ হাজার ২২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৫৫ জন। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে সরাসরি যুক্ত স্বাস্থ্য সহকারীর ২০ হাজার ৯০৯টি পদের মধ্যে ৬ হাজার ৮৮৮টি পদ বর্তমানে শূন্য। অর্থাৎ বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা গেছে রংপুর বিভাগেও। সেখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১৫৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত জনবল মাত্র ১৫ জন। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৪৫২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১১১ জন দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠপর্যায়ে সরাসরি টিকাদান কর্মসূচিতে যুক্ত স্বাস্থ্য সহকারীর ২ হাজার ২২৫টি পদের বিপরীতে কাজ করছেন ১ হাজার ৩৯৩ জন।

বিভাগীয় পরিচালকদের ভাষ্য

রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী পদে বড় ধরনের সংকট রয়েছে। পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন করে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ছয়টি জেলা—রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাটে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় কাজের চাপ অনেক বেশি।’

চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি জানান, ১১টি জেলার মধ্যে ৮টিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বাকি তিনটি জেলায় প্রক্রিয়া চলমান। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো বিভাগেই আরও জনবল প্রয়োজন। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল জানান, ছয়টি জেলাতেই বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য। তিনি বলেন, ‘জনবলসংকট থাকলেও আমরা প্রতিটি জেলায় নতুন নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক জানান, চার জেলার মধ্যে শুধু জামালপুরে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। ময়মনসিংহ সদর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলায় নতুন কোনো নিয়োগ না হওয়ায় বিদ্যমান কর্মীরা বাড়তি চাপ নিয়ে সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। গত রোববার সকালে ময়মনসিংহের নগর ভবনে

মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত একটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের বিপরীতে একজন স্বাস্থ্য সহকারী কর্মরত থাকেন। অনেক জায়গায় পদ শূন্য থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকার কর্মীরা এসে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সেরা। কিন্তু নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ায় এখন আমাদের ওপর পাহাড়সম কাজের চাপ। তবে অন্য বিভাগের কর্মীরা এগিয়ে আসায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি।’

ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ জেলায় ইতিমধ্যে নতুন নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও এখনো বেশ কিছু এলাকায় শূন্য পদ রয়ে গেছে। ফলে সারা দেশের সামগ্রিক টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে এই মুহূর্তে নতুন জনবল নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য

সার্বিক জনবলসংকট নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা দেশে স্বাস্থ্য সহকারীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনবলসংকট রয়েছে, এটি আমরা জানি। এই শূন্যতা পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগে ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এই ১ লাখের মধ্যে স্বাস্থ্য সহকারীসহ টেকনিশিয়ান, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি—সব খাতের জনবলই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে বদ্ধপরিকর।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘জনবল কম থাকলেও সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমাদের টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে। জনবলের কারণে টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে না। বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা একযোগে কাজ করায় সেবা সফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা আরও বাড়াতে কাজ করছি।’

সরকারের এই বৃহৎ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের সেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দ্রুত এই জনবল মাঠপর্যায়ে যুক্ত হলে হামের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অনেক সহজ হবে।