দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা

সমাজবিজ্ঞান ২য় পত্র

অধ্যায়-১ 
প্রিয় শিক্ষার্থী, আজ সমাজবিজ্ঞান ২য় পত্র থেকে একটি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর দেওয়া হলো।

সানজিদা আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তিনি সমাজবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত তাঁর বান্ধবী শায়লার কাছে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান। উত্তরে শায়লা তাঁকে জানান, বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের গোড়াপত্তন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক। তাঁর অগ্রণী ভূমিকার মাধ্যমে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ যাত্রা শুরু করে। প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু হওয়ার পর একটি গতিশীল বিজ্ঞান হিসেবে বাংলাদেশে এর বিকাশ অব্যাহত আছে।
প্রশ্ন:
ক. অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন শুরু হয় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে?
খ. বাংলার নবজাগরণ বলতে কী বোঝায়?
গ. বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্দীপকে উল্লেখিত অধ্যাপকের ভূমিকা তুলে ধরো।
ঘ. বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—কথাটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর: ক. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
উত্তর: খ. উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে একধরনের মুক্ত বুদ্ধির চর্চা শুরু হয়, যা বাংলার নবজাগরণ হিসেবে খ্যাত। ইউরোপের বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক আন্দোলন বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের ধ্যান-ধারণায় বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার আর্থসামাজিক উন্নতিকল্পে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়। ফলে সমাজে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। এ জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। এ ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ এ জাগরণ সৃষ্টিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
উত্তর: গ. উদ্দীপকে অধ্যাপক এ কে নাজমুল করিমকে নির্দেশ করা হয়েছে। অধ্যাপক নাজমুল করিমের হাত ধরেই বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিভাগে সহায়ক কোর্স হিসেবে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হতো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হওয়ায় সমাজবিজ্ঞানের কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং সমাজবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উৎসাহ পান। ফলে তাঁর অগ্রণী ভূমিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনেসকোর যৌথ উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ ড. পেরি বেসাইনি বিভাগের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। অধ্যক্ষ ড. পেরি বেসাইনি ও নাজমুল করিমসহ মোট চারজন শিক্ষক নতুন এ বিভাগে যোগ দেন। পরের বছর ১৯৫৮ সালে নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞান বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন এবং বিভাগের প্রথম স্থায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁর অগ্রণী ভূমিকায় সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। তিনি ‘সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষণ’ গ্রন্থসহ বিভিন্ন গ্রন্থ ও গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করেন, যা সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞানকে প্রসারিত করে।
উত্তর: ঘ. বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অবিভক্ত বাংলায় কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’, প্রভৃতি গ্রন্থ সমাজবিজ্ঞানচর্চার পটভূমি রচিত করে। গ্রন্থগুলোতে তাঁরা তৎকালীন বাঙালি সমাজের আর্থসামাজিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেন।
১৮৩৯ সালে ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁতের হাত ধরে জ্ঞানের রাজ্যে সমাজবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অবিভক্ত বাংলায় প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন শুরু হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে সমাজবিজ্ঞানের পাঠ শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে নাজমুল করিমের সার্বিক প্রচেষ্টায় ও ইউনেসকোর সহযোগিতায় ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন শুরু হয়।
বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজেও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর বিকাশ অব্যাহত রয়েছে।
অধ্যাপক নাজমুল করিমের হাত ধরেই বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু হয়। তারপর অধ্যাপক এফ আর খান, অধ্যাপক আফসার উদ্দিন, ড. রঙ্গলাল সেন, ড. অনুপম সেন, ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রকে আরও গতিশীল করেন।
মোহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ, প্রভাষক
এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ, চট্টগ্রাম