
আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণিসহ অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষা চালুর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা পুনর্বিবেচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে আগের মতো লটারির মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে গত মার্চে এক সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আকস্মিকভাবেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভর্তিতে লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলাম।’
গত মার্চে ভর্তির পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা যৌক্তিক নয়। এতে বরং শিশুদের ওপর অযাচিত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে।
ওই ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলে আসছেন, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে। পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা নতুন করে বাড়তে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়াবে। এরই মধ্যে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোচিং কার্যক্রম শুরুর অভিযোগও ওঠে।
একসময় বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নামে অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। কোচিং ও প্রাইভেট ছিল সাধারণ ঘটনা। অনেক পরিবার সন্তানদের নামী বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতো। পাশাপাশি ভর্তিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল বিস্তর। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নামকরা বা মোটামুটি ভালো বিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়া প্রায় অধরাই থেকে যেত। এ পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রথমে কেবল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় (যেসব বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো।
পরবর্তী সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে।
কিন্তু গত মার্চে ভর্তির পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার ঘোষণার পর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাঁদের ভাষ্য, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। আর শিশু বয়সে মেধার তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা যৌক্তিক নয়। এতে বরং শিশুদের ওপর অযাচিত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে লটারি যেন আরও স্বচ্ছভাবে হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
এ রকম পরিস্থিতিতে এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন চিন্তাভাবনা করছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন।
অভিভাবক ঐক্য ফোরাম নামে একটি সংগঠন আজ বিবৃতি দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তিতে লটারি চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রাথমিক স্তরের সব শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে।