পরীক্ষায় লিখতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। ফরিদপুর সরকারি ইয়াসিন কলেজ, ২ জুলাই
পরীক্ষায় লিখতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। ফরিদপুর সরকারি ইয়াসিন কলেজ, ২ জুলাই

এইচএসসি ও সমমান

এইচএসসিতে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীও এবার বেশি

উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষায় এবার অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। পরীক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে এসব শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পরীক্ষার প্রথম দিনে ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।

১১টি শিক্ষা বোর্ডে গত বছর পরীক্ষার প্রথম দিন ১৯ হাজার ৭৫৯ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। আগের বছর ২০২৪ সালে প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী। ২০২৩ সালে আটটি শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন ৫ হাজার ৫২২। ওই বছর বন্যার কারণে চট্টগ্রাম, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পরে শুরু হয়েছিল।

এবার পরীক্ষার শুধু প্রথম দিনে পরীক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বেশি নয়, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হারও উদ্বেগজনক। এ বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরমই পূরণ করেননি। মানে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী, অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। এখন প্রথম দিনের অনুপস্থিতির সংখ্যাটি যোগ করলে পরীক্ষা না দেওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেশি হবে।

এবার সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন।

প্রথম দিনের পরীক্ষা শেষে পরীক্ষাসংক্রান্ত দৈনন্দিন তথ্যে বলা হয়, প্রথম দিনে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রথমে দিনে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ১৭ হাজার ২৩৩ জন অনুপস্থিত ছিলেন। আর ৫ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।

এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে (কুরআন মাজিদ বিষয়) ৪ হাজার ৪৭৮ জন ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন (বাংলা-২) ৩ হাজার ৭৩ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মাদ্রাসায় একজন ও কারিগরিতে একজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতির পেছনে বিদ্যমান লেখাপড়ার পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দুর্বলতা নাকি পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোনো কারণ কাজ করছে—তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এস এম হাফিজুর রহমান, অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

খারাপ ‘ইন্ডিকেটর’

গতকাল সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসির পর এইচএসসিতে নির্ধারিত হারে সব সময় শিক্ষার্থী ঝরে যায়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া অথবা পরিবারের জন্য কাজে যুক্ত হওয়া...সেটি ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকত। কিন্তু এবার দেখা গেল মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরিতে ৫৪ শতাংশ ও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ৩৩ শতাংশ ঝরে গেছে। এটা বড় সংখ্যা।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তিনি মনে করেন, শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছে না, অন্যদিকে এখন পরীক্ষা সঠিকভাবে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এবার হয়তো কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী চিন্তা করেছেন...বিগত দিনের মতো প্রস্তুতি ছাড়া কেউ যেতে (পরীক্ষার হলে) পারছেন না। সে জন্য বোধ হয় হারটি বেড়ে গেছে। কিন্তু এটি খুব খারাপ ইন্ডিকেটর (সূচক)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

গবেষণার উদ্যোগ

প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিবন্ধন করা এত বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ না করা তূলনামূলক এবারই বেশি। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করেনি শিক্ষা বিভাগ।

তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিবন্ধন করেও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ থেকে বিরত থাকার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের মাধ্যমে একটি গবেষণা করা হবে।

এবার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ না করা এবং ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ পরিস্থিতির পেছনে বিদ্যমান লেখাপড়ার পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দুর্বলতা, নাকি পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোনো কারণ কাজ করছে—তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হবে এবং অদক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর। তাই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।