বাংলা ২য় পত্র: ভাবসম্প্রসারণ
প্রিয় এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বাংলা দ্বিতীয় পত্রে ১০ নম্বর প্রশ্ন থাকবে ভাবসম্প্রসারণ অথবা সারাংশ বা সারমর্ম লেখার ওপর। নিচে তোমাদের জন্য দুটি ভাবসম্প্রসারণ দেওয়া হলো।
দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য
মূলভাব: বিদ্যা ও জ্ঞান মানুষকে মহান করে তোলে, কিন্তু সেই জ্ঞান যদি কোনো দুশ্চরিত্র বা দুষ্ট ব্যক্তির করায়ত্ত হয়, তবে তা সমাজ ও ব্যক্তির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্জন ব্যক্তি বিদ্বান হলেও তাঁর সংসর্গ ত্যাগ করা উচিত। কারণ, তাঁর বিদ্যা মানবকল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের পথে ব্যবহৃত হয়।
সম্প্রসারিত ভাব: বিদ্যাশিক্ষা মানবজীবনের শ্রেষ্ঠতম অলংকার। একজন বিদ্বান ব্যক্তি স্বভাবতই সমাজের মনোযোগ ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। শিক্ষার পবিত্র আলো যাঁর জীবনে ছড়িয়ে পড়ে, তিনি অন্তরে-বাইরে আলোকিত হয়ে ওঠেন। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত ব্যক্তি সমাজকে সঠিক পথ দেখাতে পারেন এবং মানুষের কল্যাণ সাধন করেন। কিন্তু একজন বিদ্বান ব্যক্তি যদি নৈতিকতাহীন ও দুশ্চরিত্রের অধিকারী হন, তবে তাঁর সেই জ্ঞান সমাজের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্জন ব্যক্তি তাঁর মেধা ও জ্ঞানকে হীন স্বার্থে এবং ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না। তিনি তাঁর জ্ঞান দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করেন এবং সমাজের শান্তি বিনষ্ট করেন। এ কারণে বলা হয়: ‘The crown and glory of life is character’। সচ্চরিত্র হলো কল্যাণ ও সত্যের প্রতি সুতীব্র অনুরাগ, যাকে মানুষ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে। সজ্জনেরা মানুষের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন এবং ফলভারে অবনত বৃক্ষের মতো নিরহংকারী ও সংযত জীবন যাপন করেন। এ প্রসঙ্গে ভাষাবিদ ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মতে, ‘বাক্যে, কার্যে এবং চিন্তায় সামঞ্জস্য রক্ষিত হইলে মানুষের মধ্যে যে একটি পবিত্র ভাব ফুটিয়া ওঠে, তাহাকে চরিত্র বলিয়া অভিহিত করা যায়।’ দুর্জন ব্যক্তির মধ্যে এসব সুচারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে না; বরং মনুষত্ববিরোধী প্রবৃত্তিগুলোই তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি নিজের স্বার্থে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞানকে অপব্যবহার করে মানবতার জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন। চরিত্রহীন ব্যক্তি অত্যন্ত নিচু স্তরে নেমে যেতেও দ্বিধা বোধ করেন না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তাঁরা শিক্ষিত হলেও বাস্তবে প্রকৃত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাঁদের শিক্ষার সার্টিফিকেট তখন একটি অর্থহীন কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এরূপ ব্যক্তির সান্নিধ্য ও সংস্পর্শ ত্যাগ করাই মঙ্গলজনক। এ প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত দৃষ্টান্ত স্মরণ করা যায়—কোনো কোনো বিষধর সাপের মাথায় মূল্যবান মণি থাকে। সেই মণি বিপুল সম্পদের উৎস হলেও মণি লাভের আশায় বিষধর সাপের সাহচর্য কামনা করা যেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমনি বিদ্যা মূল্যবান বস্তু হলেও তা অর্জনের জন্য বিদ্বান দুর্জনের সমীপে যাওয়া বিধেয় নয়। কারণ, তাঁর সংস্পর্শে নিষ্কলুষ চরিত্রও কলুষিত হয়ে যেতে পারে।
মন্তব্য: একজন ব্যক্তির জ্ঞান তখনই অর্থপূর্ণ ও মূল্যবান, যখন তিনি সৎ ও আদর্শ মানুষ হন। কেবল বিদ্বান হলেই কেউ বরণীয় হতে পারেন না; বরং কার সঙ্গে আমরা মিশছি, তিনি সজ্জন, নাকি দুর্জন—সেটিই বিচার্য। তাই দুর্জন ব্যক্তি বিদ্বান হলেও তাঁকে সর্বতোভাবে বর্জন করা উচিত।
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন
মূলভাব: স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জন্য পরম আকাঙ্ক্ষিত ও অমূল্য সম্পদ। দীর্ঘ সংগ্রাম, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বিভেদ ও বহিঃশত্রুর ষড়যন্ত্রের হাত থেকে সেই অর্জিত স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখা আরও বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।
সম্প্রসারিত ভাব: স্বাধীনতা মানে পরনির্ভরশীলতা ও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি। এটি মানুষের জন্মগত অধিকার এবং মানবমাত্রই স্বাধীনতাকামী। পরাধীনতার গ্লানি কারও কাম্য হতে পারে না। নিজের জীবন ও সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করার জন্য মানুষ স্বাধীনতা চায়। এই স্বাধীনতা ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়—উভয় পর্যায়ের হতে পারে। নিজের রুচি ও আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার সুযোগ হলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, আর বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণমুক্ত সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন হলো রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের অন্য সব অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। যখন কোনো জাতি দীর্ঘ শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়, তখন তারা মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শুরু হয় লড়াই ও সশস্ত্র সংগ্রাম। বীরত্ব ও দেশপ্রেমের শক্তির কাছে শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক বা শোষক গোষ্ঠী পরাস্ত হতে বাধ্য হয় এবং বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশকে এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিপুল ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের মূল্য দিতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতা অর্জনের পর তা রক্ষা করার পথ আরও বেশি দুর্গম হয়ে ওঠে। সদ্য স্বাধীন একটি দেশে প্রায়ই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ চক্রান্তকারী ও বহিঃশত্রুরা দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে চায়। দেশের অর্থনীতি স্বাবলম্বী না হলে জনগণের ক্ষোভ বাড়ে, যা জাতীয় ঐক্যকে বিনষ্ট করে। আধুনিক বিশ্বে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে মানচিত্র ও পতাকার ফ্রেমে টিকিয়ে রাখা কঠিন। স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সর্বাগ্রে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে জাতি যদি একতাবদ্ধ না থাকে, তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সহজেই সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়। বিশ্বের বুকে এমন অনেক রাষ্ট্র আছে, যারা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, সুশাসনের অভাব এবং বিদেশি শক্তির ক্রমাগত হস্তক্ষেপের কারণে নিজেদের সার্বভৌমত্ব কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারছে না। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতা দূর করতে একটি শিক্ষিত ও সচেতন জাতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মন্তব্য: স্বাধীনতা একটি জাতির আত্মপরিচয়। একে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের। যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করার পর সচেতনতা ও ঐক্যের অভাবে তা রক্ষা করতে পারে না, তাদের মতো দুর্ভাগা আর কেউ হয় না। তাই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সদা জাগ্রত থাকা আবশ্যক।
ফারুক আহমেদ আবির, প্রভাষক
মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা