
নাটোরের খুদে উদ্যোক্তা তাহসিন বারি অনলাইনে সতেজ ফল, টাটকা শাকসবজি আর মাছ বিক্রি করে। নাটোরের মৌখাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিনের ব্যবসার শুরু হয়েছিল গত বছরের মে মাসে। তখন মায়ের পরামর্শে নিজেদের আমবাগানের আম দিয়েই ব্যবসা শুরু করে তাহসিন।
শুরুতে অনলাইন ব্যবসা বুঝে উঠতে পারছিল না খুদে এই উদ্যোক্তা। ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্রী হওয়ার সুবিধার্থে ক্লাসে হিসাববিজ্ঞান কিংবা বিপণন পড়লেও সত্যিকারের ব্যবসায় এসব প্রয়োগ অনেক কঠিন মনে হলো তাহসিনের কাছে। এরই মধ্যে ফেসবুকভিত্তিক নারী উদ্যোক্তাদের গ্রুপ উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরামে (উই) যুক্ত হয়েছিল তাহসিন। সেখানে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য মাস্টারক্লাসের ব্যাপারে জানতে পারে সে। এরপর মাস্টারক্লাসে অংশ নিয়ে বিপণন কৌশল, বিনিয়োগ পরিকল্পনা অথবা ক্রেতাসেবার মতো কঠিন বিষয়গুলোও আয়ত্ত করে ফেলে তাহসিন। প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা শুরুর ফলও পেয়েছে হাতেনাতে। গত বছর প্রায় ৮০ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছিল তাহসিন। আর এই মৌসুমে এখন পর্যন্তই প্রায় দেড় লাখ টাকার আম বিক্রি হয়েছে।
এভাবে গত বছর তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বছরব্যাপী মাস্টারক্লাসের আয়োজন করে উই। এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মাস্টারক্লাস ১.০ শিরোনামের এই সিরিজ কর্মশালায় ছিল ১২টি মাস্টারক্লাস। ২০২০ সালের জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই মাস্টারক্লাসের চূড়ান্ত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৬ জুন।
তাহসিনের মতো প্রায় সাত লাখ তরুণ-তরুণী অংশ নিয়েছিলেন এই মাস্টারক্লাস সিরিজে। উইয়ের সভাপতি নাসিমা আক্তার জানান, জুম এবং ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে মাস্টারক্লাস সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫১০ টাকা দিয়ে অনলাইন নিবন্ধন করে সব ক্লাসে অংশ নিতে পারতেন তরুণেরা। উদ্যোক্তা হতে চান কিংবা সদ্য উদ্যোক্তা হয়েছেন, এমন সবার কথা মাথায় রেখেই প্রতিটি ক্লাস সাজানো হয়েছিল। অনলাইনে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া, মূলধন জোগাড়, বিপণন কৌশল, পণ্য আমদানি-রপ্তানি কৌশল, কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজমেন্টসহ উদ্যোক্তার হওয়ার জন্য জরুরি প্রায় সব কটি বিষয়ের ব্যাপারে ধারণা দেওয়া হয়েছে ক্লাসগুলোতে।
এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মাস্টারক্লাসের প্রতিষ্ঠাতা সৌম্য বসু বলেন, ‘অনলাইনে একটি ব্যবসা দাঁড় করানো, ওই ব্যবসাটি টেকসই ও লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে এই মাস্টারক্লাস সিরিজে। বিশ্বের খ্যাতনামা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদ ও এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ–সংক্রান্ত ডিগ্রির আদলে এই মাস্টারক্লাস সিরিজের পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।’
সৌম্য জানান, আশপাশে প্রায়ই অনেক ব্যবসা গড়ে উঠতে দেখা যায়। শখের বশে অনেকে ব্যবসা শুরু করে হয়তো অনেকে সফলতার দেখাও পান। কিন্তু কৌশলগত ত্রুটির কারণে অনেকেই সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারেন না। ছোট-বড় যেকোনো ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে কৌশলগত দিকগুলো কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়—উদ্যোক্তাদের সেটি জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যবসার প্রতিটি ধাপে অভিজ্ঞ পরামর্শকের দিকনির্দেশনা নেওয়ার ব্যাপারে জোর দেন সৌম্য।
বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সফল উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মাস্টারক্লাসগুলো পরিচালনা করেছেন। অতিথি হিসেবে একটি করে ক্লাসে যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ।
ক্লাসগুলো হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায়। ফলে ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও অনেকটা দূর করা গেছে বলে মনে করেন উইয়ের সভাপতি নাসিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘চলমান মহামারিতে বাংলাদেশে অনেক ই-কমার্স ব্যবসা গড়ে উঠেছে। লকডাউনের শুরুর দিকে ঘরে বসেই অনেক তরুণ ব্যবসা শুরু করেছেন। তখন থেকেই উইয়ের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল আমাদের। সেই ভাবনা থেকেই মাস্টারক্লাস শুরু করেছি। অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সাড়া পাব ভাবিনি।’
এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মাস্টারক্লাসের প্রথমবারেই ইতিবাচক সাড়া পেয়ে আগামী মাস থেকে এটির দ্বিতীয় পর্ব শুরুর পরিকল্পনার কথা জানালেন নাসিমা। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এবার যাঁরা মাস্টারক্লাসের প্রথম পর্ব শেষ করবেন, তাঁদের জন্যও শিগগিরই শুরু হবে অ্যাডভান্সড মাস্টারক্লাস। দ্বিতীয় পর্বের মাস্টারক্লাস শুরুর ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে উইয়ের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে ।