সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্ত বিগত সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন এবং এই প্রক্রিয়ায় উপাচার্যরা সাধারণত শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে তাঁদের যোগ্যতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণায় অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, একজন যোগ্য উপাচার্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা, গবেষণা ও আস্থার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তাই নতুন সরকারের নিকট মানুষের প্রত্যাশা অনেক।
কিন্তু কিছু অভিযোগ রয়েছে যে উপাচার্যরা অনেক সময় রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় গিয়ে তাঁদের সমর্থন চেয়েছেন, যা উচ্চশিক্ষার মানের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ বহুবার উঠে এসেছে। এই প্রথা ইদানীং শুরু হয়নি, এটি একটি দীর্ঘকালীন কর্মপ্রবাহ। নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের স্বজনপ্রীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ অনেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে, যা আমাদের জাতির জন্য লজ্জাজনক। অতীতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের পরিবারের ৯ সদস্যসহ ৭৩ শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও বলেছে, নিয়োগে অসংগতি রয়েছে। এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সংবাদপত্রে উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে প্রশ্ন হলো একজন উপাচার্যের নিজ পরিবারের ৯ জন সদস্য নিয়োগ পান কীভাবে? এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আমার কর্মস্থলে সাবেক এক উপাচার্যের ছেলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। যদিও পরে তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। অন্য এক সাবেক উপাচার্য জামাতা ও মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করেছিলেন। এ ছাড়া রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সদ্য সাবেক এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি করে ভাই, শ্যালক-শ্যালিকা, আত্মীয়স্বজন এবং পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। অধিকাংশ নিয়োগই ছিল উপাচার্যের নিকটাত্মীয়দের। এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও আমাদের শিক্ষকদের জন্য লজ্জাজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাঁরা ছাত্র থাকা অবস্থায় চাঁদা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, যাঁদের পরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু শিক্ষক নিয়োগ পান, এর মানে এই নয় যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ভালো হয় না। অধিকাংশ শিক্ষক শীর্ষস্থান অধিকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন, তবে তদবির ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে শিক্ষক হওয়া বন্ধ করা গেলে দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণ বয়ে আসবে।
তবে কেন এসব ঘটছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত সময়ের দাবি। অনেকেই মনে করেন, উপাচার্য নিয়োগে সমস্যা রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-১৯৮০ সালে যেসব উপাচার্য নিয়োগ হয়, তাঁরা বেশ প্রশংসনীয় ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো বিতর্ক বা অপকর্ম ছিল না, ফলে তাঁরা উপাচার্য হিসেবে সম্মানিত ও মূল্যায়িত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, তদবিরের মাধ্যমে উপাচার্য হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। যাঁদের তদবিরের পরিমাণ যত বেশি, তাঁরা তত বেশি সম্ভাব্য উপাচার্য। উপাচার্যরা মনে করেন, একবার নিয়োগ পেলে সরকার চার বছরে তাঁদের সরাবে না, তাই তাঁরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁরা নিজেদের মতো সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন, যাতে কোনো অন্যায় সহজেই পাস করানো যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উপাচার্যরা নিজের মতো একটি বলয় তৈরি করেন। এরপর শুরু হয় নানা অপকর্ম। যেসব শিক্ষক প্রতিবাদ করবেন, তাঁদের সাইডে রাখা হয়। যদি কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তবে তা তদন্ত করে প্রমাণিত হলে তাঁকে অপসারণের ব্যবস্থা করা গেলে, অনেক অন্যায়, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি কমে আসত।
উপাচার্য নিয়োগ যদি আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হতো, তাহলে তা রাষ্ট্র ও শিক্ষক সমাজের জন্য মঙ্গলজনক হতো। উপাচার্য নিয়োগে একাডেমিক এক্সিলেন্সি, গবেষণায় দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনা, সামাজিক উন্নয়নে অবদান এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, উপাচার্য শুধু একাডেমিক দিক দেখেন না, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক দিক নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা প্রদান করেন। তাই একজন উপাচার্যের নেতৃত্বদান ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তদবিরের মাধ্যমে উপাচার্য হওয়া একদমই কাম্য নয়, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম এবং অন্যায় অনেক সময় উঠে আসে। দেখা যায়, শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে অনেকেই তদবিরে দিনরাত চেষ্টা করেন, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সময় এসেছে এসব চিরতরে বন্ধ করার।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি দৃঢ় নীতিমালা গ্রহণ করে, তবে এসব অনিয়ম কমানো সম্ভব। শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস, ফলাফলের ভিত্তিতে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এ ছাড়া উপাচার্য নিয়োগ নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে, কারণ, তাঁরা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দিলে তাঁরা দায়িত্ব পালন শেষে চলে যেতে পারেন, তবে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন এবং চক্ষুলজ্জার ভয়ে থাকেন।
এমনকি নিয়মানুযায়ী, কিছু উপাচার্য শিক্ষকদের নানা পদে দায়িত্ব দিয়ে থাকেন, যা সঠিক নয়। উপাচার্যদের এসব অনিয়মের কারণে তাঁরা আগের মতো সম্মানিত ও মূল্যায়িত হন না। সুতরাং উপাচার্যদের উচিত, নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, যাতে উপাচার্য পদসহ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করা যায়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ