
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে আমরা প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করি, যেন এটি শিক্ষকতার সঙ্গে সংযোগ ও নীতিগত সমন্বয়হীন একমাত্রিক ক্ষেত্র। যেন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই শিক্ষকতার একমাত্র সারবস্তু, আর শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কেবল প্রশাসনিক জ্ঞাননির্ভর একটি দাপ্তরিক দায়িত্ব। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, জননীতি ও প্রশাসন শাস্ত্র ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। শিক্ষা কেবল পাঠদান নয়; এটি একটি সমন্বিত নীতি, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন চক্র। এখানে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, মূল্যায়ন কাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি—সবই একই নীতিগত বৃত্তের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। সেই পটভূমিতে প্রশ্নটি মৌলিক: শিক্ষা ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক ও নৈতিক অভিভাবক কারা?
সাধারণ মানুষ তো বটেই, উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের কাছেও কেন সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা নিজেদের ক্যাডার বা কর্মকর্তা পরিচয় দেন, সে বিষয়টি অস্পষ্ট। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ক্যাডারগুলোর গঠন, পরিচালনা, কর্মপরিধি এবং এ–সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণার অভাব রয়েছে। এখনো প্রায় সব কটি মন্ত্রণালয়ের সচিব একটিমাত্র ক্যাডারের কর্মকর্তা। দু–একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ অধিদপ্তর ও দপ্তরের মহাপরিচালক বা পরিচালকও সেই একমাত্র ক্যাডারের কর্মকর্তা। ফলে আমজনতা থেকে প্রাজ্ঞজন—সবার কাছে গুটিকয় সার্ভিসে কর্মরত ব্যক্তিরাই কর্মকর্তা বলে বিবেচিত হন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি কলেজে যোগদান করা শিক্ষকেরা প্রকৃতপক্ষে কর্মকর্তা হিসেবেই চাকরিতে যোগদান করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে শুরুতে ১৪টি ক্যাডার ছিল, যা ভিন্ন ভিন্ন সার্ভিস নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম একটি সার্ভিস হলো বিসিএস (শিক্ষা: সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) বর্তমানে মোট ২৬টি ক্যাডারে বিভক্ত। সেখানেও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারি কলেজ ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরে তাঁরা দায়িত্ব পালন করেন বলেই তাঁদের কর্মকর্তা ও শিক্ষক—দ্বৈত পরিচয়ে পরিচিত হতে হয়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তা নিছক ব্যবস্থাপনা নয়; এটি রাষ্ট্রের জ্ঞানদর্শন নির্ধারণের প্রক্রিয়া। একটি বইয়ের ভাষা, বিষয়বিন্যাস ও শিক্ষণফল নির্ধারণের মাধ্যমে গঠিত হয় একটি প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো। বছরের শুরুতে বই হাতে পাওয়া কেবল প্রশাসনিক সক্ষমতার পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি জবাবদিহি ও নীতিগত শৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ।
একইভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা–সহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, গোপনীয়তা সংরক্ষণ ও ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ এমন এক উচ্চমাত্রার একাডেমিক দায়িত্ব, যা পাঠদানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া সুসমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা দুরূহ। মূল্যায়নবিজ্ঞান, শেখার ফল নিরূপণ ও মানদণ্ড রক্ষা—এসবই শিক্ষা প্রশাসনের অন্তর্গত বিশেষায়িত দক্ষতা।
রাষ্ট্রের সাধারণ প্রশাসনে যেমন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অপরিহার্য বিবেচিত হয়, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনেও শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত হওয়া উচিত। পাঠদানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি নীতিমালা ও বাস্তবতার দূরত্ব অনুধাবন করতে পারেন। তিনি জানেন, শিক্ষার্থীর বোধগম্যতা কোথায়, সীমাবদ্ধতা কোথায় ও সম্ভাবনা কোথায়।
১৮৫৪ সালের উডস ডেসপাচ–পরবর্তী সময়ে ১৮৫৫ সালে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রশাসনিক কাঠামো ছিল, যা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করত। স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা পৃথক অধিদপ্তরে বিন্যস্ত হলেও ১৯৮১ সালে ডিপিআই রূপান্তরিত হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পরিণত হয়। এই বিবর্তন প্রমাণ করে, শিক্ষা প্রশাসনের শিকড় একটি সমন্বিত কাঠামোয় প্রোথিত।
দীর্ঘ সময় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। শিক্ষা সার্ভিসবহির্ভূত জনবল পদায়নের ফলে যে কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি পেশাগত ধারাবাহিকতারও বিচ্যুতি।
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস, ১৯৮০ অনুযায়ী স্কুল ও কলেজ শাখা ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত পৃথক থাকলেও পরবর্তী সময় একটি অভিন্ন ক্যাডারে একীভূত হয়েছে। অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে মাধ্যমিক শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও শিক্ষা ক্যাডার হওয়ার বিধান সুস্পষ্ট। এই নীতির যৌক্তিক সম্প্রসারণ হিসেবে উচ্চশিক্ষা কমিশন বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে সরকারি কলেজ শিক্ষকদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকা যুক্তিযুক্ত। কারণ, সরকারি কলেজগুলোই দেশের উচ্চশিক্ষার বৃহত্তম ক্ষেত্র।
শ্রেণিকক্ষ ও প্রশাসনকে পরস্পরবিরোধী মেরু হিসেবে দেখা একধরনের নীতিগত সরলীকরণ। শিক্ষা প্রশাসন একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেখানে কারিকুলাম তত্ত্ব, মূল্যায়নবিজ্ঞান, শিক্ষানীতি বিশ্লেষণ ও ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। পাঠদানের অভিজ্ঞতা ছাড়া এই ক্ষেত্র পরিচালনা করলে নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান বৃদ্ধি পায়।
একইভাবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বাস্তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অবকাঠামোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। সমন্বিত অংশগ্রহণ ও নীতিগত সামঞ্জস্য ছাড়া এই সম্পর্ক কার্যকর হতে পারে না।
সংস্কার প্রস্তাবনায় শিক্ষা ক্যাডারকে কেবল কলেজশিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় মডেলে পিএইচডি ও গবেষণা প্রকাশনাকে গ্রেড–১ বা গ্রেড–২ পদোন্নতির প্রধান শর্ত হিসেবে আরোপের প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ভেঙে পৃথক অধিদপ্তর গঠনের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারকে একমাত্র কলেজকেন্দ্রিক কাঠামোয় সীমিত করার প্রচেষ্টা শিক্ষা প্রশাসনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার পরিপন্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদোন্নতিতে নির্দিষ্টসংখ্যক গবেষণা প্রকাশনা আবশ্যিক হলেও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের জন্য পৃথক সেবা বিধি বিদ্যমান। প্রবেশনের সময় শেষে সরকারি কর্ম কমিশনের বিভাগীয় পরীক্ষা, বনিয়াদি প্রশিক্ষণ, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা—এসব পদ্ধতিগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই তাঁদের পদোন্নতি নির্ধারিত হয়। সরকারি কলেজ পর্যায়ে গবেষণার অবকাঠামো সীমিত। অতএব অভিন্ন গবেষণা মানদণ্ড আরোপ বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তবে পিএইচডিধারীদের জন্য দ্রুত পদোন্নতির পৃথক সুযোগ রাখা যেতে পারে, যাতে গবেষণায় আগ্রহীরা প্রণোদনা পান, কিন্তু পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না হয়।
শ্রেণিকক্ষ ও প্রশাসনকে পরস্পরবিরোধী মেরু হিসেবে দেখা একধরনের নীতিগত সরলীকরণ। শিক্ষা প্রশাসন একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেখানে কারিকুলাম তত্ত্ব, মূল্যায়নবিজ্ঞান, শিক্ষানীতি বিশ্লেষণ ও ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। পাঠদানের অভিজ্ঞতা ছাড়া এই ক্ষেত্র পরিচালনা করলে নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষা রাষ্ট্রের বনিয়াদি কাঠামো। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন এমন পেশাজীবীদের হাতে থাকা উচিত, যাঁদের পেশাগত পরিচয় শিক্ষা। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সেই ধারাবাহিকতার প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁদের ভূমিকা কেবল পাঠদান নয়; নীতি নির্মাণ, বাস্তবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণেও তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
এখন প্রয়োজন আবেগমুক্ত, প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত পুনর্মূল্যায়ন। শিক্ষা প্রশাসন কি একাডেমিক পেশাজীবীদের নেতৃত্বে বিকশিত হবে, নাকি সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর উপশাখায় পরিণত হবে—এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি ক্যাডারের প্রশ্ন নয়; এটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন।
*সচিব তালুকদার, শিক্ষক ও লেখক