যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চীনা শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। আয়নির্ভরতা ও ক্যাম্পাসে চীনের প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও চলতি বছর জানুয়ারির শেষ সময়সীমার মধ্যে চীন থেকে ব্রিটিশ স্নাতক কোর্সে আবেদন জমা পড়েছে রেকর্ড ৩৪ হাজার ৩৮০টি, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
ইউনির্ভাসিটি অব চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-ইউকাসের (UCAS) তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবণতা চীনকে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় দেশ হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন একটি সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যে ১ লাখ ৪৩ হাজার ২০০ চীনা শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুইজনই চীনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের প্রতি চীনা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, বেইজিং এই আর্থিক নির্ভরতাকে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা দমন করতে পারে।
টেলিগ্রাফের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ১৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা শিক্ষার্থীরা প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড টিউশন ফি প্রদান করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট টিউশন আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি সাধারণত ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। যেখানে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ফি সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড, সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ২০ হাজার পাউন্ডের বেশি হতে পারে।
ব্রিটিশ ক্যাম্পাসে চীনের প্রভাব বাড়ছে—এমন অভিযোগও জোরালো হয়েছে। গত বছর শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় সিনজিয়াং অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে কাজ করা অধ্যাপক লরা মারফিকে তাঁর গবেষণা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। অভ্যন্তরীণ নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই গবেষণার ফলে চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
চীনা বিশেষজ্ঞরা একে যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চীনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী সংখ্যাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহারের প্রথম নজির বলে দাবি করেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, এটি প্রশাসনিক কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল। পরে অধ্যাপক মারফিকে আবার গবেষণা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চলতি সপ্তাহের চীন সফরে শিক্ষা সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। এদিকে ব্রিটিশ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিদেশে শাখা ক্যাম্পাস খোলার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে, যেন তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকে।
লেবার পার্টি ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রতিটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য ৯২৫ পাউন্ড লেভি আরোপ করা হবে, যা দরিদ্র ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ব্যবহৃত হবে।
সামগ্রিকভাবে গত বছর চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য কমলেও তাঁরা এখনো শীর্ষস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮০। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আবেদন বেড়েছে। চলতি বছর মার্কিন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৯২০টি স্নাতক আবেদন এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা তহবিল নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
তবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮ শতাংশ কমেছে, বিশেষ করে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য আনার ওপর নিষেধাজ্ঞাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।