শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন জরুরি

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণ হয় শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নীতিনিষ্ঠতা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষকেরা পাঠদান করেন, কিন্তু সেই শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। শিক্ষকেরা কতটা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করে পরিচালনা কমিটির ওপর।

বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি পরিচালনা কমিটির হাতে নেই। তবু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, পদোন্নতি–সংক্রান্ত সুপারিশ, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, পুরস্কার প্রদান কিংবা প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো পরিচালনা কমিটির অধীনেই রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়ভারও মূলত এই কমিটির ওপর বর্তায়। ফলে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যোগ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে এসব বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ। তাই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা শিথিল বা বাতিল করার বিষয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা চলছে, তা শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। শিক্ষা এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, সৃজনশীলতা বিকাশ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে সচেতন ও দক্ষ নেতৃত্ব।

সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ওপর। ফলে এই কমিটির নেতৃত্ব কতটা সৎ, শিক্ষিত, সচেতন ও দূরদর্শী, তা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড শিথিল করা হয়, তবে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা অনুধাবনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে এসব বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বর্তমানে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হয়, তবে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা বা তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিকতা বা আবেগপ্রবণতা দেখা দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনেক সিদ্ধান্ত সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণনির্ভর। পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা না থাকলে অনেক সময় সিদ্ধান্তগুলো যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।

চতুর্থত, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার ঝুঁকি বাড়ে। পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী না হয়ে স্বেচ্ছাচারী ও স্বার্থবাদী হয়ে ওঠে। তাঁরা লাভজনক মনে করেই কমিটিতে থাকার জন্য মরিয়া হন! সৎ, দক্ষ, সুশিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সুযোগ আছে বলেই কমিটির পদ নেওয়ার এত প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। তাঁরা অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায় এবং শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যেই রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকেন, তখন শিক্ষকসমাজ অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করেন এবং নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন।

অন্যদিকে পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে সৎ, শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা থাকলে সাধারণত একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর সুশৃঙ্খল করতে পারে। ফলে শিক্ষকেরা পেশাগত মর্যাদা অনুভব করেন এবং শিক্ষার্থীরাও একটি স্বাস্থ্যকর শিক্ষা পরিবেশ পায়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া একই বিষয় নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়, দ্বিতীয়টি মূলত প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর। তাই এ ধরনের দায়িত্বে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সেই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

তাই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখা কেবল প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি দুর্বল হয়, তবে শক্ত ভিত্তির ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সততা, ভদ্রতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, দূরদর্শিতা এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যাবশ্যক।

* লেখক: মো. রহমত উল্লাহ্, সাবেক অধ্যক্ষ