
বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষ নগরীগুলোর মধ্যে আমাদের রাজধানী ঢাকা অন্যতম। প্রায়ই শীর্ষে থাকে। এই বায়ুদূষণের আগাম সতর্কতা পরিমাপ করার মডেল দিয়ে কীভাবে বায়ুদূষণ কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আবু সেলিম। যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর ইউনিভার্সিটিতে এ বিষয়ে পিএইচডি করছেন। গত আগস্টে ফুল ফান্ড স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসেন। গবেষণা শেষে দেশে ফিরে ঢাকার বায়ুর মান উন্নয়নে কাজ করতে চান সেলিম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেড়ে উঠা আবু সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক শহরে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে শীতকালে সূক্ষ্ম বায়ুকণা দূষণ (PM.) বিপজ্জনক মাত্রা পার করে ফেলে। বায়ুদূষণের এমন ভয়াবহতা আমাকে এ বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহী করেছে।’
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ঢাকায় কিছুদিন চাকরি করেন আবু সেলিম। এরপর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার আন্তসীমান্তীয় বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা করেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বেইলর ইউনিভার্সিটিতে পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি করছেন আবু সেলিম। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় এয়ার কোয়ালিটি ফোরকাস্টিং অর্থাৎ আগাম বায়ুমান পূর্বাভাস মডেল উদ্ভাবন। তিনি বলেন, এই গবেষণায় আধুনিক নিউমেরিক্যাল মডেল, স্যাটেলাইট তথ্য এবং গ্রাউন্ড মেজারমেন্ট ডেটা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক পূর্বাভাস তৈরির গবেষণা করছেন।
আবু সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার লক্ষ্য হলো এই উন্নত পূর্বাভাস পদ্ধতি যেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ না থাকে। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বোঝতে ও আগাম সতর্কতা দিতে এই ধরনের মডেল কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই আমার প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো বায়ুদূষণ সম্পর্কে মানুষ সাধারণত ঘটনার সময় অনুভব করতে পারেন কিন্তু তখন করার কিছুই থাকে না। কিন্তু যদি আগেই জানা যায় কোনো দিন বা কোনো এলাকায় দূষণ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে যেতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগাম ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে অনেক রোগ থেকে জনগণ মুক্তি পাবে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশ ও বায়ুদূষণ–সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আবু সেলিম বলেন, ‘শুধু দূষণের পরিমাপ থাকলেই যথেষ্ট নয় প্রয়োজন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা। বর্তমানে আমার গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ রেজোল্যুশনের স্যাটেলাইট ভিত্তিক মডেল ও ডেটা সেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এই মডেলগুলোর মাধ্যমে বায়ুপ্রবাহ, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দূষণের উৎস একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।’
আবু সেলিম বলেন, একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর তালিকায় থাকা চীন গত এক দশকে পরিকল্পিত নীতি, কঠোর বাস্তবায়ন এবং পূর্বাভাসভিত্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বড় ধরনের উন্নতি করেছে। চীনের উদাহরণ থেকে সহজেই বোঝা যায় কার্যকর পদক্ষেপ নিলে দূষণ কমানো সম্ভব। তবে এ জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
পিএইচডি শেষে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণ পূর্বাভাস ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করতে চান আবু সেলিম। তিনি বলেন, ‘গবেষণার ফল যেন শুধু একাডেমিক প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নীতিনির্ধারণ ও জনসচেতনতা তৈরিতে ব্যবহার করতে চাই। বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্য এয়ার কোয়ালিটি ফোরকাস্টিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। এটি করতে পারলে আমাদের দেশের জনগণ অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাবে এবং দেশের বায়ুর মানও উন্নত হবে।’