
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা মানেই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া—এমন একটি ধারণা সমাজে প্রচলিত থাকলেও বর্তমান চিত্র অনেকটাই আলাদা। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলো বিশ্বনাগরিক গড়ার প্রক্রিয়ায় দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাচ্ছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার সঠিক পাঠের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা আত্মপরিচয় সমুন্নত রেখেই বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলা চর্চা নিয়ে সংশয় থাকলেও বাস্তব চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক। ঢাকার ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সাবিক। তার মা সায়মা নাছিম প্রথম আলোকে জানান, তাঁর সন্তানের স্কুলে নিয়মিত বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সমান আগ্রহী করে তুলতে নানা রকম কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি জানান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমে বাংলাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দিবসগুলো উদ্যাপনেও বিশেষ নজর দিচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা পয়লা বৈশাখের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেশীয় মূল্যবোধের প্রতি তাদের গভীর আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসের সঙ্গে বাস্তব জীবনের রীতিনীতিগুলো যুক্ত করার ফলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজের দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কেও সচেতন থাকছে।
ভবিষ্যতের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পৃথিবীতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে ভালো ফলাফলের সঙ্গে আনুষঙ্গিক দক্ষতাও সমান জরুরি। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো সহশিক্ষা কার্যক্রম বা কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিকে ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সামাজিক ক্লাব শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বগুণ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এ কার্যক্রমগুলো শিশুকে পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জগতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ করে তোলে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিভিন্ন সোশ্যাল ক্লাবের মাধ্যমে সামাজিক সেবামূলক কাজে যুক্ত হয়ে তারা সমাজের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতাগুলো সম্পর্কে জানতে পারছে।
স্কুলজীবনের অন্যতম সার্থকতা চরিত্র গঠন। বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের আচরণের ওপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবিষয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি কতটা সহমর্মী বা ‘এমপ্যাথিক’ হতে পারল—সেটাও এখন আধুনিক শিক্ষার অন্যতম মাপকাঠি। শ্রেণিকক্ষে নৈতিক শিক্ষার নিয়মিত চর্চা শিশুকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। অভিভাবকদের মতে, স্কুল থেকে পাওয়া এই সহমর্মিতা ও সততার শিক্ষাগুলো দীর্ঘ মেয়াদে শিশুকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার এই লড়াই এখনকার শিক্ষাব্যবস্থার এক ইতিবাচক দিক।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ যে শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেখলা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলা ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি নানা কারণে হতে পারে। বিশেষ করে ক্লাসরুমের বাইরে পাঠাভ্যাস কিংবা ভাষা চর্চায় অনাগ্রহের পেছনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
মেখলা সরকার বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরাই নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকেন না। তবে তাঁরা সচেষ্ট হলে বিশ্বমানের শিক্ষার পাশাপাশি দেশীয় মূল্যবোধের চর্চাও সমানভাবে সম্ভব।’
মেখলা সরকারের মতে, একটি শিশুর শিকড় যত শক্তিশালী হবে, ভবিষ্যতে বিদেশে গেলেও তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। কারণ, নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি মজবুত থাকলে যেকোনো পরিবেশেই মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষার মাধ্যমের পাশাপাশি শিশুর বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ। বর্তমানে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর সহযোগিতামূলক আবহ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে বেশ সহায়ক। বিশেষ করে নেতৃত্বের চর্চা ও সামাজিক মেলামেশার অবারিত সুযোগ তাদের আত্মিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। যে শিশু ছোটবেলা থেকেই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয় ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শিখছে, কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিজীবনে তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। মানসিক এই দৃঢ়তা তাকে ভবিষ্যতের জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো এখন আর কেবল ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র নেই। দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বৈশ্বিক মানদণ্ডের এই সমন্বয় শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। আধুনিক পাঠদান পদ্ধতিতে নৈতিকতা ও দক্ষতার এই সমন্বয়ই আগামীর দক্ষ জনশক্তি গড়ার প্রধান চাবিকাঠি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।