অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে একটি ডিপ্লোমা কোর্স বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এরই মধ্যে এ কোর্সে দ্রুত শিক্ষার্থী ভর্তির চেষ্টা করছে কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিাষ্ঠান। কোর্সটিতে শিক্ষার্থী টানতে কোথাও ছাড় দেওয়া হচ্ছে, কোথাও একই দিনে ভর্তি প্রস্তাব ও ভর্তি নিশ্চিতের কথা জানাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। অস্ট্রেলিয়ার সরকার সতর্ক করে বলেছে, নিয়ম এড়ানো হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) কোর্সটিতে আগামী ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বন্ধ করছে। সরকারের আশঙ্কা, প্রকৃত পড়াশোনার উদ্দেশ্যের পরিবর্তে কিছু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ও ভিসার মেয়াদ ধরে রাখতে কোর্সটিকে ব্যবহার করছে। কোর্সটি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রায় ৪৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এ কোর্সে এখন পড়াশোনা করছেন। এ ছাড়া কোর্সটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর আবেদন নিবন্ধিত রয়েছে, অর্থাৎ এরা ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
কোর্সটি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা আসার পর সেপ্টেম্বরজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন শিক্ষা-অভিবাসন এজেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দ্রুত ভর্তি হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিছু বিজ্ঞাপনে কোর্স ফিতে ছাড় এবং তাৎক্ষণিক ভর্তি নিশ্চিতকরণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। একটি বেসরকারি কলেজ আবার অভিবাসন এজেন্টদের জন্য বিশেষ কমিশন, একই দিনে অফার লেটার এবং ভর্তি নিশ্চিতকরণের কথা জানিয়েছে। কোর্সটির দুটি বিশেষ ভর্তি কার্যক্রমের তারিখও দেওয়া হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর ও ২ অক্টোবর ২০২৬। অর্থাৎ কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের মাত্র তিন দিন আগে পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্ট (লার্নিং) কোর্সটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বন্ধ করছে; কারণ, কিছু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা ধরে রাখতে এটি ব্যবহার করছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারের কোর্সটি বন্ধের সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েটি কারণ আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর (কোর্স বদলে ভর্তি হওয়া) বেড়ে যাওয়ায় সরকার কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্তের দিকে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্য কোর্স থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা অব ম্যানেজমেন্টে স্থানান্তর ২০২০ সালে ৫১০ জন থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় ৪ হাজারে জনে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে কোর্সটিতে ভর্তিতে অনুমোদন পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই এখনো পড়াশোনা শুরু করেনি।
সরকারের অভিযোগ, কিছু শিক্ষার্থী উচ্চতর পর্যায়ের পড়াশোনা থেকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন পর্যায়ের কোর্সে ভর্তি হয়ে একই ভিসার আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান এবং কাজের সুযোগ ধরে রাখছিল। এ ধরনের ‘ভিসা হপিং’ ঠেকাতে সরকার ইতোমধ্যে কোর্স পরিবর্তনের নিয়ম আরও কঠোর করেছে। ভবিষ্যতে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোর্স বদলানোর ক্ষেত্রেও নতুন ভিসার প্রয়োজন হবে। ভিসা হপিং হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অনেক সময় প্রকৃত পড়াশোনার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় টিকে থাকার জন্য বারবার কম খরচের কোর্স বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করানো ঠেকানো।
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া (আইইএএ IEAA)-এর প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড কোর্সটি বাতিল করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, এটি সিস্টেমের ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টাকারী কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ‘সরকার সম্পূর্ণ সঠিক কারণেই প্রকৃত নয় এমন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দেশে থাকার জন্য কোর্সটি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানগুলোর সব সময়ই একটি স্থান থাকবে…তারা সম্পূর্ণ সঠিক কারণেই এই ধরনের কারখানার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিস্টেম থেকে বের করে দিতে চায়।’
তবে কোর্সটিতে ইতোমধ্যে পড়াশোনা শুরু করা শিক্ষার্থীদের তা শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ভর্তি নির্ধারিত ছিল, তাঁদের ভিসার শর্ত পূরণে বিকল্প উচ্চতর কোর্সে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের একই সময়ে একাধিক কোর্স করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার মান ও ভিসা ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি কোর্স পরিবর্তন, শিক্ষার্থী ভিসা এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থানকারীদের বিষয়ে একাধিক কড়াকড়ি আরোপ করেছে।