
আগের তুলনায় আসন্ন অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, যা কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এটা ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দের মূল অগ্রাধিকার হতে হবে শিক্ষার্থীদের শেখার বিষয়ের (শিখন) ওপর। শিক্ষা খাতে বাজেটের সফলতা বোঝা যাবে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর তা প্রভাব ফেলছে কি না। কারণ, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে এখন বড় ধরনের সংকট চলছে। শেখার ক্ষেত্রে শিখনঘাটতি থাকছে।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কেমন হলো শিক্ষা বাজেট: বাস্তবতা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন বক্তারা। আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়নকর্মীরা বক্তব্য দেন।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে ইতিবাচক উল্লেখ করে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিখন ফল অর্জনে প্রভাব ফেলবে কি না, সেটাই বড় বিষয়।
এ সময় রাশেদা কে চৌধূরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে পরে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদও জানান তিনি।
শিখন ফলের ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন। তিনি বলেন, শিক্ষার মানের যে অবস্থা, শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে শিখছে না। একটা ‘লার্নিং ইমার্জেন্সির দিকে যাচ্ছে। এটা দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। তাই বরাদ্দের শুধু পর্যাপ্ততা নয়, বরাদ্দ আসলেই কাজে লাগবে কি লাগবে না, সেটার একটা বড় মাপকাঠি হবে চলমান ‘শিখনসংকটকে’ ওই বরাদ্দ কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। যে খরচ শিখন ফল অর্জনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে না পারে, সেটা অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাজেটে বরাদ্দের নানা দিক বিশ্লেষণ করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কেবল খরচ বাড়ালেই শিক্ষার গুণগত মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না এবং যে ধরনের শিক্ষা চাওয়া হয়, সেটা নিশ্চিত করতে পারে না। সে কারণেই প্রশ্নটি আসে, অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং সুশাসন ইত্যাদি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাস্টিসটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদাৎ বলেন, যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, সেই টাকা খরচ করার দক্ষতা ও সক্ষমতার কথা হচ্ছে। সেটার প্রভাব নিয়েও তাঁরা চিন্তিত। এসব মৌলিক চ্যালেঞ্জ যখন সামনে আসে, তখন আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
যে খরচ শিখন ফল অর্জনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে না পারে, সেটা অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবেইমরান মতিন, নির্বাহী পরিচালক, বিআইজিডি
সংবাদ ব্রিফিংয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে শিক্ষার বাজেট বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির উপপরিচলক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি শিক্ষা খাতের বাজেটের ইতিবাচক দিক, চ্যালেঞ্জ ও বিদ্যমান নানা বিষয় তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশে উন্নীত করা, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন রকমের সুপারিশ তুলে ধরেন।
প্রসঙ্গত, আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা এবং জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অবশ্য শুধু শিক্ষাবিষয়ক ২ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, শিক্ষা খাত বলতে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে যে শিক্ষা নিয়ে কাজ করে, সে তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।