শিল্পী মাহবুবা রহমান
শিল্পী মাহবুবা রহমান

শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মানের: ফেরদৌসী রহমান

ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গায়িকা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মাহবুবা রহমানকে নিয়ে লিখেছেন সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান

আমার ছোটবেলা কেটেছে ভারতে। কলকাতা থেকে যখন ঢাকায় এলাম, তখন আমরা প্রথমে পুরোনো ঢাকার পাতলাখান লেনে উঠি এবং পরবর্তী সময়ে পুরানা পল্টনের বাসায় চলে আসি। মাহবুবা রহমান আপাকে আমি তখন থেকেই চিনি। তখন তাঁর নাম ছিল নিভা রানী দাস। আমি তখন ১০, ১১ বা ১২ বছরের কিশোরী মাত্র। বলা যেতে পারে, আমার ক্যারিয়ারের একদম শুরু থেকেই ওনাকে আমি দেখছি। পরে জানতে পারলাম, তাঁর বিয়ে হয়েছে আবুল হাসনাতের সঙ্গে, তখন তিনি হলেন মাহবুবা হাসনাত এবং পরবর্তীকালে খান আতাউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর সবশেষে তিনি মাহবুবা রহমান নাম গ্রহণ করেন।

মাহবুবা আপা আমার আব্বার (প্রখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ) অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন এবং আমাদের বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল তাঁর। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর যে গুণটি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত এবং যার জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম, তা হলো শিল্পের প্রতি তাঁর অগাধ নিষ্ঠা ও সিনসিয়ারিটি। তিনি অত্যন্ত সিরিয়াস শিল্পী ছিলেন; যখন গান গাইতেন, তখন সুরের জগতের মধ্যে একেবারে ডুবে যেতেন। গানের প্রতি তাঁর এই একাগ্রতা ও নিবেদন ছিল সত্যিই দেখার মতো।

সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান

রেডিওতে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা অনেক গান একসঙ্গে গেয়েছি। নাজিমুদ্দিন রোডের সেই ছোট্ট স্টুডিওতে নজরুলজয়ন্তী, রবীন্দ্রজয়ন্তীসহ বিভিন্ন বিশেষ দিনে আমরা যখন সমবেত কণ্ঠে বা কোরাসে গান গাইতাম, মাহবুবা আপাও আমাদের সঙ্গে থাকতেন। সেই সময়ে লায়লা আরজুমান্দ বানু, আফসারী খানম, হোসনা বানু খানমসহ আরও অনেক গুণী শিল্পীর সঙ্গে আমরা কাজ করতাম, আর তাঁদের মধ্যে আমিই ছিলাম বয়সে সবচেয়ে ছোট। মাহবুবা আপার স্বামী আবুল হাসনাত তাঁকে খুব ভালোবাসতেন এবং গান গাওয়ার ব্যাপারে প্রচুর উৎসাহ ও সাপোর্ট দিতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বরেণ্য সংগীতব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমানকে বিয়ে করেন এবং তাঁরা তাঁদের মতো করে সংসার করেছেন।

মাহবুবা রহমান

সংগীতের ক্ষেত্রে মাহবুবা আপা সব ধরনের গানই মোটামুটি ভালো গাইতেন। কারণ, ভালো শিল্পীরা সাধারণত সব ধারার গানেই পারদর্শী হন। তবে আমার স্মৃতিতে তাঁর কণ্ঠের লোকসংগীত বা ‘ফোক’ ধাঁচের গানগুলোই বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে। বিশেষ করে আব্বার গানগুলো তিনি যখন গাইতেন, তাঁর গলায় তা অপূর্বভাবে ফুটে উঠত। যদিও তিনি আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, তাঁর কণ্ঠটি লোকসংগীতের জন্যই বেশি মানানসই ছিল।

মানুষ হিসেবে মাহবুবা আপা ছিলেন অত্যন্ত মিষ্টি, অমায়িক ও কিছুটা শান্ত প্রকৃতির। আমি যখন আস্তে আস্তে বড় হলাম, তখন বড়দের অনুষ্ঠানগুলোতে ওনাদের সঙ্গে গান করতাম। সেসব অনুষ্ঠানের আগে দুই-তিন দিন ধরে মহড়া চলত এবং মহড়ার ফাঁকে অনেক আড্ডা হতো। কিন্তু আড্ডার পরিবেশে তিনি খুব একটা হইচই করতেন না; বরং তিনি ছিলেন কিছুটা মিতভাষী। শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মানের এবং কাজের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ও গুণমান ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়।

মাহবুবা রহমানের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছে বেশ অনেক দিন আগে। তবে ওনার মেয়ে রুমানা ফেসবুকে ছবি দিলে আমি নিয়মিত দেখতাম। শুনেছিলাম, তিনি অসুস্থ এবং তবে বয়স অনুযায়ী বেশ শক্তপোক্তই আছেন। তাঁর এই প্রয়াণে দেশ একজন অত্যন্ত গুণী শিল্পীকে হারাল, যিনি একুশে পদক ও শিল্পকলা একাডেমি পদকের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। মাহবুবা আপার চলে যাওয়া আমাদের সংগীতাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।