বলিউডে সুযোগ পাওয়াটাই যেখানে অনেকের কাছে স্বপ্ন, সেখানে জাহ্নবী কাপুর এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যা অনেক প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীও কল্পনা করেন। অল্প কয়েক বছরের ক্যারিয়ারেই তিনি ভারতের দুই বৃহত্তম তেলেগু সুপারস্টার—জুনিয়র এনটিআর ও রামচরণের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। ‘দেবারা’ ও ‘পেড্ডি’র মতো বড় বাজেটের ছবিতে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, নির্মাতাদের আস্থা ও বাজারমূল্যের দিক থেকে তিনি এখন অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন তারকা।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এই ছবিগুলো মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের আলোচনায় বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে—জাহ্নবী কাপুর কি সত্যিই তাঁর অভিনয়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে উঠছেন, নাকি তিনি কেবল বড় তারকাদের ছবিতে গ্ল্যামার উপস্থিতি হয়ে থাকছেন?
সুযোগের অভাব নেই, কিন্তু চরিত্র কোথায়
‘দেবারা’ মুক্তির সময় জাহ্নবীকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। এর একটি বড় কারণ তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার। তিনি প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেত্রী শ্রীদেবীর মেয়ে। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে শ্রীদেবীর জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। ফলে তেলেগু দর্শকদের একাংশ শুরু থেকেই জাহ্নবীকে আপন করে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ‘দেবারা’ মুক্তির পর সেই উচ্ছ্বাসের বড় অংশই মিলিয়ে যায়। ছবিতে তাঁর চরিত্র থাঙ্গামের উপস্থিতি সীমিত ছিল। গল্পের মূল স্রোতে চরিত্রটির প্রভাবও ছিল সামান্য। অনেক দর্শকের মতে, চরিত্রটি বাদ দিলেও ছবির গল্পে তেমন কোনো পরিবর্তন হতো না।
অবশ্য এর দায় পুরোপুরি অভিনেত্রীর ওপর চাপানো যায় না। চরিত্রটি যেভাবে লেখা হয়েছিল, সেখানে অভিনয়ের সুযোগও সীমিত ছিল। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়—সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কি একজন অভিনয়শিল্পী নিজের উপস্থিতি দিয়ে চরিত্রকে স্মরণীয় করে তুলতে পারেন না?
হলিউড বা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য। অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী দর্শকের মনে দাগ কেটেছেন। কিন্তু ‘দেবারা’য় জাহ্নবীর ক্ষেত্রে সেই ছাপ অনেকেই খুঁজে পাননি।
‘পেড্ডি’ আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিল
যদি কেউ মনে করে থাকেন ‘দেবারা’ ছিল কেবল একটি ব্যতিক্রম, তাহলে চলতি সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ‘পেড্ডি’ সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। রামচরণ অভিনীত এই ছবিতে জাহ্নবী কাপুরের চরিত্র অচিয়াম্মা। গল্পের শুরুতে তাঁকে একজন রাজনৈতিক নেতার মেয়ে হিসেবে দেখা যায়, যিনি বাবার নির্বাচনী প্রচারণার অংশ।
শুরুতে মনে হয়, চরিত্রটির কিছু সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ছবি যত এগোয়, ততই দেখা যায়, চরিত্রটি নিজের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ফেলছে।
অনেক সমালোচকের মতে, ছবিটি শুধু জাহ্নবীর চরিত্রকেই দুর্বল করেনি; বরং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ছবির বেশ কিছু দৃশ্যে সম্মতি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নারীর মর্যাদার মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত সমস্যাজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে নায়ক-নায়িকার সম্পর্কের কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যেখানে নায়কের কিছু আচরণকে রোমান্টিক হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে সেগুলো হয়রানি হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একধরনের আচরণকে অপরাধ হিসেবে দেখালেও একই ধরনের আরেকটি আচরণকে প্রেমের প্রকাশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
ক্যামেরা কি অভিনেত্রীর দিকে, নাকি তাঁর শরীরের দিকে
‘পেড্ডি’ নিয়ে আরেকটি বড় সমালোচনা এসেছে ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে। অনেক দর্শকের অভিযোগ, ছবিতে জাহ্নবীর চরিত্রের আবেগ, চিন্তা বা ব্যক্তিত্বের চেয়ে তাঁর শারীরিক উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্যামেরা বারবার এমনভাবে তাঁকে উপস্থাপন করেছে, যেখানে চরিত্রের গভীরতার চেয়ে গ্ল্যামারই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
এটি নতুন কোনো অভিযোগ নয়। ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় বহু দশক ধরেই নারীদের ‘গ্ল্যামার অবজেক্ট’ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আজকের সময়ে এসে যখন নারী চরিত্রের উপস্থাপন নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে, তখন এমন নির্মাণ আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
জাহ্নবী কি নিজেও এ প্রবণতার অংশ হয়ে যাচ্ছেন? এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জাহ্নবী কাপুর যে অভিনয় করতে পারেন না, এমন অভিযোগ তোলা কঠিন।
‘গুঞ্জন সাক্সেনা’, ‘মিলি’ কিংবা ‘বাওয়াল’-এর মতো ছবিতে জাহ্নবী অন্তত চেষ্টা করেছেন চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে। সেই অভিনয় নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে একজন অভিনেত্রীকে দেখা গেছে, যিনি চরিত্র নির্মাণে আগ্রহী।
সে কারণেই জাহ্নবীর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো অনেককে বিস্মিত করছে।
যে অভিনেত্রী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বারবার চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছার কথা বলেন, তিনিই কেন এমন সব ছবি বেছে নিচ্ছেন, যেখানে তাঁর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় নাচ, গান আর নায়কের প্রেমিকা হয়ে থাকা? প্রশ্নটা শুধু নির্মাতাদের নয়, জাহ্নবীর প্রতিও।
শ্রীদেবীর মেয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
জাহ্নবীর ক্যারিয়ারের সঙ্গে অনিবার্যভাবেই চলে আসে তাঁর মা শ্রীদেবীর নাম। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে শ্রীদেবী শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলেন না; তিনি ছিলেন দুর্দান্ত অভিনয়শিল্পী। কমেডি, ট্র্যাজেডি, রোমান্স কিংবা বাণিজ্যিক ছবি—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখে গেছেন।
একইভাবে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী সৌন্দর্যও বড় তারকাদের বিপরীতে অভিনয় করেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
বর্তমান প্রজন্মে আলিয়া ভাট, সাই পল্লবী, নয়নতারা কিংবা সামান্থা রুথ প্রভুর মতো অভিনেত্রীরা বারবার প্রমাণ করেছেন, মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাতেও শক্তিশালী নারী চরিত্র তৈরি করা সম্ভব। তাঁরা শুধু নায়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং গল্পের চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছেন।
জাহ্নবীর ক্ষেত্রেও দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল তেমনই।
বড় ছবিতে থাকা আর বড় অভিনেত্রী হওয়া এক নয়
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অসংখ্য অভিনেত্রী বড় তারকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু সবাইকে দর্শক মনে রাখেননি। দর্শক মনে রেখেছেন তাঁদের, যাঁরা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন।
আজ থেকে ১০ বা ১৫ বছর পর হয়তো খুব কম মানুষ মনে রাখবেন, জাহ্নবী কাপুর কতগুলো সুপারস্টারনির্ভর ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা অবশ্যই মনে রাখবেন, তিনি এমন কোনো চরিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন কি না, যা দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। সেখানেই এসে দাঁড়ায় জাহ্নবী কাপুরের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তাঁর কাছে সুযোগ আছে। বড় প্রযোজক আছেন। বড় নায়ক আছেন। বড় বাজেট আছে।
এখন প্রয়োজন শুধু একটি জিনিস—এমন চরিত্র, যা জাহ্নবীকে গ্ল্যামার আইকন নয়, একজন সত্যিকারের অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। কারণ, তারকা হওয়া আর অভিনেতা হওয়া এক জিনিস নয়। আর জাহ্নবী কাপুরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তিনি ঠিক কোন পরিচয়টি বেছে নিতে চান।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে