
প্রতি সপ্তাহেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটান নীতা ভোজওয়ানি—কখনো ধনী মানুষ দরিদ্র সেজে থাকার গল্প, কখনোবা প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসা ক্রুদ্ধ ভূতের কাহিনি। এসবই তিনি দেখেন এক নতুন ধরনের বিনোদনে; দুই মিনিটের ছোট ছোট পর্বে তৈরি ‘মাইক্রো-ড্রামা’।
এ কনটেন্টগুলো সাধারণত ৫০টির বেশি পর্বে গড়ে ওঠে, কিন্তু প্রতিটি পর্ব দুই মিনিটের কম। মুঠোফোনে দিনের ফাঁকে ফাঁকে দেখার জন্য বানানো এই ‘স্ন্যাকেবল’ কনটেন্ট এখন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ পেরিয়ে ভারতেও বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বাজার বলছে, এটাই এখন ভবিষ্যৎ। বিনিয়োগ সংস্থা লুমিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে এই বাজার এখন ৩০ কোটি ডলারের (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন) এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৪৫০ কোটি ডলার (৪.৫ বিলিয়ন) হতে পারে। সংস্থাটি একে দেশের ‘সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বিনোদন মাধ্যম’ বলছে।
পশ্চিম ভারতের উদয়পুর শহরের গৃহিণী নীতা ভোজওয়ানি জানান, ইনস্টাগ্রামে একটি বিজ্ঞাপন দেখেই প্রথম এই জগতে ঢোকা। এখন নিয়মিতই দেখেন—এমনকি স্টোরি টিভির মতো প্ল্যাটফর্মে বার্ষিক সাবস্ক্রিপশনও কিনে ফেলেছেন। ‘সময় কাটানোর জন্য দারুণ,’ মাইক্রো–ড্রামা নিয়ে বললেন ৩৬ বছর বয়সী নীতা।
শহর-গ্রামজুড়ে এক নতুন নেশা
ভোজওয়ানির মতোই লাখো ভারতীয়—বড় শহর থেকে ছোট শহর—মজে আছেন এই মাইক্রো-ড্রামায়। গল্পের ধরন অনেকটাই পরিচিত—হিন্দি টিভি সিরিয়ালের মতো অতিনাটকীয় অভিনয়, ক্লিশে প্লট। কখনো হতভাগ্য এক যুবকের জীবনে হঠাৎ অতিপ্রাকৃত শক্তি এসে সাহায্য করছে, কখনো ভিন্ন সামাজিক শ্রেণির প্রেমিক-প্রেমিকা সব বাধা অতিক্রম করে বিয়ে করছে।
তবু বাজার বলছে, এটাই এখন ভবিষ্যৎ। বিনিয়োগ সংস্থা লুমিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে এই বাজার এখন ৩০ কোটি ডলারের (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন) এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৪৫০ কোটি ডলার (৪.৫ বিলিয়ন) হতে পারে। সংস্থাটি একে দেশের ‘সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বিনোদন মাধ্যম’ বলছে।
স্টার্টআপ থেকে জায়ান্ট—সবাই ঝুঁকছে
ভারতে এই ট্রেন্ড শুরু হয় ২০২৪ সালের দিকে। কুকু ও রিলাইজের মতো স্টার্টআপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শক টানতে শুরু করে। শুরুতে এটাকে অনেকেই সাময়িক ‘ফ্যাড’ মনে করলেও এখন চিত্র বদলাচ্ছে।
ভারতের বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকছে এই খাতে। জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেজ ও বালাজি টেলিফিল্মস ইতিমধ্যে মাইক্রো-ড্রামা তৈরিতে অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে।
এদিকে এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন জিওস্টার গত এপ্রিল মাসে চালু করেছে ‘তাড়কা’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ইতিমধ্যে ১০০টির বেশি শো রয়েছে—স্কুলজীবনের গল্প থেকে শুরু করে বিলিয়নিয়ার আর নিরাপত্তারক্ষীর প্রেম—সবই আছে সেখানে।
শোনা যাচ্ছে, যশ রাজ ফিল্মস ও রেড রিলিজ ইন্টারটেইনমেন্টের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগের কথা ভাবছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষক বানিতা কোহলি খান্ডেকার বলছেন, ‘ডিজনি বা ওয়ার্নার ব্রাদার্স যদি সিনেমা থেকে থিম পার্ক—সব জায়গায় থাকতে পারে, তাহলে বড় সংস্থাগুলোর মাইক্রো-ড্রামায় আসাটাও স্বাভাবিক।’
বদলে যাওয়া অভ্যাস
কোভিড-পরবর্তী সময়ে দর্শকের অভ্যাস বদলে গেছে। টিভির বিজ্ঞাপন আয় কমছে, বক্স অফিসে আয় বাড়ছে ঠিকই—কিন্তু সেটা নির্ভর করছে হাতে গোনা ব্লকবাস্টারের ওপর। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনোদন মাধ্যম হিসেবে মাইক্রো-ড্রামা বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এই ফরম্যাটের জন্ম চীনে—সেখানে এগুলো ‘দুয়ানজু’ নামে পরিচিত। ড্রামাবক্স ও রিলশর্টের মতো অ্যাপের মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় হয়। ২০২৪ সালে চীনে মাইক্রো-ড্রামার আয় দেশটির সিনেমা হলের আয়কেও ছাড়িয়ে যায়।
কম খরচে বেশি কনটেন্ট
ভারতে একটি ৫০ পর্বের মাইক্রো-ড্রামা বানাতে খরচ হয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি। অর্থাৎ একটি ব্লকবাস্টার সিনেমার বাজেটে বানানো যায় এক ডজনের বেশি এমন ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য’ মাইক্রো-ড্রামা।
কুকু প্ল্যাটফর্মের গগন গোয়েল বলছেন, ‘মানুষ এই কনটেন্টের জন্য টাকা দিচ্ছে।’ প্ল্যাটফর্মটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী লাল চাঁদ বিসু বলেন, ‘সিনেমা হলের পর ভিডিও কনটেন্টের এটি চতুর্থ বিবর্তন—মোবাইল-প্রথম প্রিমিয়াম কনটেন্ট।’
দর্শক ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
দর্শক সাধারণত ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের বিজ্ঞাপন থেকে এই কনটেন্টে আসেন; কিন্তু তাঁদের ধরে রাখা কঠিন।
‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যদি দর্শক আকৃষ্ট না হয়, তারা অন্য শো বা প্ল্যাটফর্মে চলে যায়,’ বলছেন বিসু।
গবেষণা বলছে, অফিসের বিরতি বা যাতায়াতের সময় মানুষ এই ভিডিওগুলো দেখে। তাই গল্প হতে হয় সহজ, দ্রুত আকর্ষণীয়। প্রায় প্রতিটি পর্ব শেষ হয় ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’-এ, যাতে দর্শক পরের পর্বে ঢুকে পড়েন।
সংখ্যার খেলা বনাম গুণগত মান
কুকু বর্তমানে মাসে প্রায় ১৫০টি শো তৈরি করে—আগামী দুই বছরে সেটি এক হাজারে নিয়ে যেতে চায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে।
এই বিপুল উৎপাদনের ফলে অনেক সময় গল্প নকল বা বিভিন্ন ভাষায় রিমেক করা হয়।
তবে কেউ কেউ বলছেন, টিকে থাকতে হলে গুণগত মানেই জোর দিতে হবে।
মুম্বাইভিত্তিক আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ক্লিপের প্রধান নির্বাহী পরিচালক ভিকি বাহরি বলেন, ‘অনেকেই চীনা বা কোরিয়ান শোর রিমেক করছে; কিন্তু আমরা মৌলিক গল্প তৈরি করছি—ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী আইপি গড়তে।’
ভিকি বাজেট বাড়িয়ে ২০ থেকে ৪০ লাখ রুপি পর্যন্ত নিয়ে গেছেন, পরিচিত অভিনেতাদেরও যুক্ত করছেন। কুকুও তাদের বাজেট বাড়াচ্ছে।
সামনে কী?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আয় নিশ্চিত করা। অনেক প্রতিষ্ঠানই এখনো লাভ ছাড়াই বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। প্রযোজনা সংস্থা ডন ভানজারা এখন জিওস্টারের জন্য মাইক্রো–ড্রামা তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সংকেত ভানজারা বলছেন, ‘শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে ভালো মানের কনটেন্ট বানাতে হবে। তাহলেই দর্শক থাকবে, আর মাইক্রো-ড্রামা সত্যিকারের বিনোদন মাধ্যম হয়ে উঠবে।’
বিবিসি অবলম্বনে